আহলেহাদীছ জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা

 

আহলে হাদীছ জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা (শেষ কিস্তি)

berries-black-blurred-background-975231.png

আহলেহাদীছ জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা (শেষ কিস্তি)

মূল (উর্দূ) : মাওলানা আবু যায়েদ যমীর
ভারতের প্রখ্যাত আহলেহাদীছ আলেম।
অনুবাদ : তানযীলুর রহমান
শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়া, রাজশাহী।

ভুল ধারণা-৯

আহলেহাদীছরা জঙ্গীবাদের শিক্ষা দেয় :

ইসলামী দাওয়াহর উন্নতি-অগ্রগতি এবং বিশ্বপরিমন্ডলে ইসলাম গ্রহণের স্রোতকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য কোথাও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আবার কোথাও মিশনারী প্রচার-প্রপাগান্ডা চালিয়ে ইসলামের উপর এ অপবাদ আরোপ করা হচ্ছে যে, ইসলাম সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থাকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানকারী ধর্ম। প্রত্যেকে স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য আজকে সারা পৃথিবীতে মিডিয়া, কতিপয় ধর্মীয় গোষ্ঠী ও সস্তা রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে এই অন্যায় ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে।

মাযহাবী গোঁড়ামিতে নিমজ্জিত কোন কোন মূর্খ মুসলমানকে এই মিথ্যা প্রপাগান্ডার মাধ্যমে আখের গোছানোর জন্য এই তত্ত্বকে আহলেহাদীছদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করতে দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে এটা একটা অত্যন্ত সস্তা ও কার্যকরী অস্ত্রে পরিণত হয়েছে যে, একটি এলাকায় কোন আহলেহাদীছ কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর দাওয়াত দিতে শুরু করলে তাদের দাওয়াতকে প্রতিহত করার জন্য যেকোন উপায়ে তার উপর জঙ্গীবাদের অপবাদ দেওয়ার হীন চেষ্টা করা হয় এবং তাকে পুলিশের মাধ্যমে হয়রানি করা হয়। আর মানুষকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে তার থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা করা হয়।

১. আহলেহাদীছদের নিকটে পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করা নিন্দনীয় কাজ : 

না ইসলাম সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার শিক্ষা দেয়, আর না তার প্রকৃত অনুসারী আহলেহাদীছরা তা শিক্ষা দেয়। ইসলামে ফাসাদ সৃষ্টি করা একটি নিষিদ্ধ কাজ। মহান আল্লাহ বলেন,وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ إِنَّ اللهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِيْنَ ‘আর পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অনর্থ সৃষ্টিকারীদের পসন্দ করেন না’ (ক্বাছাছ ২৮/৭৭)

আহলেহাদীছদের নিকটে কেবল পৃথিবীতে ফাসাদ বিস্তার করা নিন্দনীয় কাজ তা নয়, বরং তা কামনা করা এবং সেজন্যে কোন উপায় অবলম্বন করাও এক জঘন্য কাজ।

২. অমুসলিমদের সাথেও উত্তম ও ন্যায়সঙ্গত আচরণ করা উচিত :

ইসলামী শিক্ষার আলোকে আহলেহাদীছদের নিকটে মানুষ নিজ নিজ অবস্থান  থেকে সদাচরণ পাওয়ার হকদার,  এমনকি সে অমুসলিম হ’লেও। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,لَا يَنْهَاكُمُ اللهُ عَنِ الَّذِيْنَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّيْنِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِيْنَ- ‘দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালবাসেন’ (মুমতাহিনাহ ৬০/৮)

জানা গেল যে, কারো কেবল অমুসলিম হওয়া তাকে সদাচরণ ও ইনছাফ থেকে বঞ্চিত করে না।

৩. আহলেহাদীছদের নিকটে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হারাম : 

ইসলামে জীবনের (চাই তা মুসলিম বা অমুসলিম যারই হোক) গুরুত্ব কতটুকু তা বুঝার জন্য কুরআন মাজীদের একটি আয়াত পাঠ করাই যথেষ্ট। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ كَتَبْنَا عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ أَنَّهُ مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا- ‘এ কারণেই আমরা বনু ইস্রাঈলের উপর বিধিবদ্ধ করে দিয়েছি যে, যে কেউ জীবনের বদলে জীবন অথবা জনপদে অনর্থ সৃষ্টি করা ব্যতীত কাউকে হত্যা করে, সে যেন সকল মানুষকে হত্যা করে। আর যে ব্যক্তি কারো জীবন রক্ষা করে, সে যেন সকল মানুষের জীবন রক্ষা করে’ (মায়েদাহ ৫/৩২)

কুরআন মাজীদের এ আয়াত থেকে একথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, একজন মানুষকে হত্যা করা সমগ্র মানব জাতিকে হত্যা করার সমতুল্য এবং একজন মানুষের জীবন বাঁচানো সমগ্র মানবতার জীবন বাঁচানোর সমতুল্য।

৪. আহলেহাদীছদের নিকটে কাফেরের উপরেও যুলুম করা বৈধ নয় : 

জীবনের সম্মান ও মর্যাদার ক্ষেত্রে এই মূলনীতি এত গুরুত্বপূর্ণ যে, কাউকে হত্যা করা তো দূরের কথা কোন অমুসলিমকে কষ্ট দেওয়াও ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধ। কোন ব্যক্তির মুসলমান হওয়া তাকে এ অধিকার দেয় না যে, সে কোন অমুসলিমের সাথে বাড়াবাড়ি করবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,اتَّقُوا دَعْوَةَ الْمَظْلُوْمِ وَإِنْ كَانَ كَافِراً فَإِنَّهُ لَيْسَ دُوْنَهَا حِجَابٌ ‘মাযলূম ব্যক্তির বদদো‘আ থেকে বেঁচে থাক, যদিও সে কাফের হয়। কারণ তার দো‘আ ও আল্লাহর মাঝে কোন পর্দা থাকে না’।[1]

এ হাদীছ থেকে একথা একেবারেই সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, যুলুম যুলুমই, যার সাথেই তা করা হোক না কেন। একজন অমুসলিম ব্যক্তির সাথেও বাড়াবাড়ি করা একজন মুসলমানকে আল্লাহর শাস্তি লাভের হকদার বানিয়ে দেয়।

উক্ত আয়াত সমূহ ও হাদীছগুলিতে যে সত্য বিধৃত হয়েছে আহলেহাদীছগণ তারই প্রবক্তা ও প্রচারক। এখানে একথা লক্ষ্যণীয় যে, সব দ্বীন-ধর্মের অনুসারী এবং প্রত্যেক মাসলাক ও মাযহাবের অনুসারীদের মাঝে এমন ব্যক্তিরাও থাকে, যারা সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তাকে বিনষ্ট করে দেয়। সেকারণ কোন এক শ্রেণীকে সমাজে নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার দোষে অভিযুক্ত করা ন্যায় ও ইনছাফকে হত্যা করার নামান্তর। আবার দায়িত্বশীল নয় এমন ব্যক্তির কোন তৎপরতার কারণে কোন জামা‘আতের সবাইকে অপরাধী মনে করা ঠিক তেমনি, যেমন কোন এক ব্যক্তির ভুলের কারণে তার পুরো পরিবারকে অপরাধী সাব্যস্ত করে তাদেরকে ফাঁসী দেওয়া। চাই তারা তার কর্মকান্ডের খন্ডন ও সংশোধনে লেগে থাকুক না কেন।

আর এটি যুলুম, বেইনছাফী ও অপবাদ আরোপ করার নিকৃষ্টতর রূপ। নবী করীম (ছাঃ) এরশাদ করেছেন,إِنَّ أَعْظَمَ النَّاسِ فِرْيَةً لَرَجُلٌ هَاجَى رَجُلاً فَهَجَا الْقَبِيلَةَ بِأَسْرِهَا ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকটে সবচেয়ে বড় মিথ্যা অপবাদ আরোপকারী সে ব্যক্তি, যে কারো কুৎসা রটনা করার সময় পুরো গোত্রের কুৎসা রটনা করে’।[2]

ভুল ধারণা-১০ :

আহলেহাদীছরা মুসলমানদের উপর কুফরীর ফৎওয়া দেয় :

কাউকে কাফের আখ্যায়িত করা এবং তার উপর কুফরীর ফৎওয়া আরোপ করাকে ‘তাকফীর’ বলা হয়। ‘তাকফীর’ বা কাফির আখ্যায়িত করা একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও দায়িত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কোন কোন ক্ষেত্রে এটি যরূরী হয়ে যায়, কিন্তু এটা এত স্পর্শকাতর ব্যাপার যে, এতে ব্যক্তিগত অসন্তুষ্টি অথবা বেপরওয়া ও অজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রদত্ত ফায়ছালা স্বয়ং কাফের প্রতিপন্নকারী ব্যক্তিকে আল্লাহর নিকটে অপরাধী বানিয়ে দেয়।

১.আহলেহাদীছদের নিকটে তদন্ত ব্যতীত কারো উপরে কুফরীর ফৎওয়া দেওয়া হারাম : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেছেন,أَيُّمَا رَجُلٍ قَالَ لأَخِيهِ يَا كَافِرُ، فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا ‘যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইকে কাফের বলবে, তাদের দু’জনের কোন একজনের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হবে’।[3]

ছহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এভাবে এসেছে,إِنْ كَانَ كَمَا قَالَ وَإِلاَّ رَجَعَتْ عَلَيْهِ ‘যদি সে ব্যক্তি সত্যিই এরকম হয় তাহ’লে ঠিক আছে, অন্যথা একথা যে কাফের বলবে তার উপর বর্তাবে’।[4]

ইবনু হিববানের বর্ণনায় এ শব্দগুলি এসেছে যে, إِنْ كَانَ كَافِرًا وَإِلاَّ كَفَرَ بِتَكْفِيْرِهِ- ‘যদি সে প্রকৃতই কাফের হয় তাহ’লে ঠিক আছে, অন্যথা কাফের প্রতিপন্নকারী ব্যক্তি কাফের বলার কারণে কুফরী করল’।[5]

জানা গেল যে, যদি ফায়ছালা সত্যের উপর ভিত্তিশীল হয় তাহ’লে কাফের প্রতিপন্নকারী ব্যক্তি দায়মুক্ত হ’ল, কিন্তু যদি ব্যাপারটা এর উল্টো হয় তাহ’লে অন্যকে কাফের আখ্যা দেওয়া তার নিজেরই কুফরীর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

একজন মানুষ কোন সময় অজ্ঞতাবশত এমন কাজ করে বসে যদিও সেটা কুফরী বা শিরক হয়ে যায়, কিন্তু স্রেফ অজ্ঞতার কারণেই তা হয়। সে কুফর ও শিরককে হালাল মনে করে করে না; বরং কাজটি যে কুফরী বা শিরকী কাজ তা সে আদতে জানেই না। এমতাবস্থায় আলেমের দায়িত্ব হ’ল তাকে কাফের আখ্যায়িত করা নয়; বরং শিক্ষা দেওয়া। এর প্রমাণ স্বয়ং নবী করীম (ছাঃ)-এর একটি ঘটনা থেকে পাওয়া যায়।

২. কর্ম ও কর্তার উপর বিধান জারী করা পৃথক বিষয় : 

আবূ ওয়াকিদ আল-লায়ছী বলেন,خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى حُنَيْنٍ، وَنَحْنُ حَدِيثُو عَهْدٍ بِكُفْرٍ، وَكَانُوا أَسْلَمُوا يَوْمَ الْفَتْحِ، قَالَ: فَمَرَرْنَا بِشَجَرَةٍ، فَقُلْنَا: يَا رَسُولَ اللهِ اجْعَلْ لَنَا ذَاتَ أَنْوَاطٍ كَمَا لَهُمْ ذَاتُ أَنْوَاطٍ، وَكَانَ لِلْكُفَّارِ سِدْرَةٌ يَعْكِفُونَ حَوْلَهَا، وَيُعَلِّقُونَ بِهَا أَسْلِحَتَهُمْ يَدْعُونَهَا ذَاتَ أَنْوَاطٍ، فَلَمَّا قُلْنَا ذَلِكَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: اللهُ أَكْبَرُ وَقُلْتُمْ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ كَمَا قَالَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ لِمُوسَى: {اجْعَلْ لَنَا إِلَهًا كَمَا لَهُمْ آلِهَةٌ، قَالَ إِنَّكُمْ قَوْمٌ تَجْهَلُونَ}، لَتَرْكَبُنَّ سُنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে হুনাইনের যুদ্ধে বের হ’লাম। তখন আমাদের কুফরীর যামানা খুব নিকটে ছিল। (রাবী বলেন যে,) তারা মক্কা বিজয়ের দিন মুসলমান হয়েছিলেন। তিনি বলেন, একটা গাছের পাশ দিয়ে অতিক্রম কালে আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমাদের জন্য একটি ‘যাতে আনওয়াত্ব’ দিন, যেমন ওদের ‘যাতে আনওয়াত্ব’ রয়েছে। মূলতঃ কাফেরদের একটা কুল গাছ ছিল, যার পাশে তারা একত্রিত হ’ত এবং (যুদ্ধে বিজয় লাভের জন্য এতে) তাদের অস্ত্র ঝুলিয়ে রাখত। তারা এটাকে ‘যাতে আনওয়াত্ব’ নামে অভিহিত করত। (ছাহাবী বলেন,) যখন আমরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে একথা বললাম, তখন তিনি বললেন, আল্লাহু আকবার, ঐ সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার জীবন রয়েছে, এটিতো সেরূপ কথা যেরূপ মূসা (আঃ)-কে বনু ইসরাঈল বলেছিল,اجْعَلْ لَنَا إِلَهًا كَمَا لَهُمْ آلِهَةٌ، قَالَ إِنَّكُمْ قَوْمٌ تَجْهَلُونَ ‘আমাদের জন্য একটি উপাস্য দিন, যেমন তাদের (মুশরিকদের) বহু উপাস্য রয়েছে। এর উত্তরে মূসা (আঃ) তাদেরকে বলেছিলেন, তোমরা মূর্খ সম্প্রদায়’। (এরপর তিনি বললেন,) তোমরা তোমাদের পূর্বের লোকদের রীতি-নীতি অবশ্যই অবলম্বন করবে।[6]

এই ঘটনায় চিন্তার বিষয় এই যে, নবী করীম (ছাঃ) তাদের যাতে আনওয়াত্বের আবেদনকে বণী ইসরাঈলের বাতিল মা‘বূদের আবেদনের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বলেছেন। কিন্তু যেহেতু সেসব লোক সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী ছিল এবং তারা অনেক বিষয় জানত না, সেজন্য তিনি তাদেরকে কাফের বলেননি; বরং তাদের কর্মকান্ডের ব্যাপারে তাদেরকে সতর্ক করে খোলাছা করে দিয়েছেন যে, তাদের কাজটি কত মারাত্মক। এজন্য অজ্ঞতাবশত কুফরী বাক্য প্রয়োগকারী ব্যক্তিকে কাফের আখ্যায়িত করার পরিবর্তে তাকে সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত।

৩. আহলেহাদীছদের নিকট অপরাধী সেই ব্যক্তি, যে হক প্রকাশিত হওয়ার পরেও হককে প্রত্যাখ্যান করে :

কোন কোন সময় তাহক্বীক্ব অথবা বুঝের ভুলের কারণে কোন আলেমের পক্ষ থেকেও এমন কোন কথা বা কাজ সংঘটিত হয়ে যায়, যেটাকে কুফরী আখ্যায়িত করা যায়, কিন্তু স্বয়ং সেই ব্যক্তির উপর এই বিধান জারী করা যায় না। বরং সেটাকে ভুল আখ্যায়িত করা হয়। ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন,وَأَمَّا “التَّكْفِيرُ”: فَالصَّوَابُ أَنَّهُ مَنِ اجْتَهَدَ مِنْ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَصَدَ الْحَقَّ فَأَخْطَأَ: لَمْ يُكَفَّرْ؛ بَلْ يُغْفَرُ لَهُ خَطَؤُهُ. وَمَنْ تَبَيَّنَ لَهُ مَا جَاءَ بِهِ الرَّسُوْلُ فَشَاقَّ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَاتَّبَعَ غَيْرَ سَبِيْلِ الْمُؤْمِنِيْنَ: فَهُوَ كَافِرٌ. وَمَنْ اتَّبَعَ هَوَاهُ وَقَصَّرَ فِي طَلَبِ الْحَقِّ وَتَكَلَّمَ بِلَا عِلْمٍ: فَهُوَ عَاصٍ مُذْنِبٌ- ‘কাফের আখ্যায়িত করার ক্ষেত্রে সঠিক মত এই যে, উম্মতে মুহাম্মাদীর কেউ হক অন্বেষণে ইজতিহাদ করতে গিয়ে ভুল-ত্রুটি করলে তাকে কাফের আখ্যায়িত করা যাবে না। বরং তার ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়া হবে। পক্ষান্তরে যার নিকটে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক আনীত বিধান প্রকাশিত হয়ে যায় এবং হেদায়াত প্রকাশ হওয়ার পরেও সে রাসূল (ছাঃ)-এর বিরুদ্ধাচারণ করে এবং মুমিনদের পথের পরিবর্তে অন্য পথ অবলম্বন করে সে কাফের। আর যে ব্যক্তি স্বীয় প্রবৃত্তির পূজা করে, হক্ব অন্বেষণে অবহেলা করে এবং না জেনে কথা বলে সে অবাধ্য, পাপী’ (কাফের নয়)।[7]

বুঝা গেল যে, হক প্রকাশিত হওয়ার পর তা প্রত্যাখ্যান করা মানুষকে কাফেরে পরিণত করে। এমন ব্যক্তির কুফরী স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরেও বিশেষ করে যখন সে তার এ কুফরী চিন্তা-ধারাকে মুসলিম উম্মাহর মাঝে প্রচর করবে, তখন তাকে মুসলমান বলা দ্বীনী আবেগের দুর্বলতা এবং মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনায় শিথিলতার ফল। এটা বুঝার জন্য মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর ব্যাপারটা একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

এজন্য একথা মন-মগজে প্রোথিত করা দরকার যে, কোন মানুষের কাছে দলীল-প্রমাণ না পৌঁছার কারণে যদি হক গোপন থেকে যায় অথবা দলীলগুলো বুঝতে ভুল করার কারণে তার সিদ্ধান্ত কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক হয় তাহ’লে তার সামনে সত্য বিষয়টাকে তুলে ধরার পরিবর্তে তার উপর কুফরীর ফৎওয়া প্রয়োগ করা কল্যাণকামিতার দাবী এবং দূরদৃষ্টি, দয়া ও করুণাগুণের পরিপন্থী।

কাফের আখ্যায়িত করার ব্যাপারে আহলেহাদীছদের এটাই নীতি। কিন্তু অনেক মানুষ এসব বিষয় বুঝার জন্য আহলেহাদীছ আলেম-ওলামা অথবা এ বিষয়ে বিদ্যমান বই-পুস্তকের দিকে প্রত্যাবর্তন করে না বিধায় তারা ভুল বুঝের মধ্যে নিপতিত হন। আসলে যখন কোন আমলের ব্যাপারে কিছু মানুষ আহলেহাদীছদের নিকট থেকে শুনে যে, এরূপ কাজ করা শিরক বা কুফরী তখন সে তৎক্ষণাৎ মনে করে যে, এসব কাজ যারা করে তাদের প্রত্যেককে আহলেহাদীছরা কাফের আখ্যায়িত করে। অথচ ব্যাপারটি তা নয়। আহলেহাদীছদের নিকটে অজ্ঞতার মধ্যে নিমজ্জিত ব্যক্তির ব্যাপারটি জেনে বুঝে হককে প্রত্যাখ্যানকারী ব্যক্তি থেকে ভিন্ন।

শেষ কথা :

তাহক্বীক্ব বা প্রকৃত সত্য উদঘাটন, ন্যায়নীতি ও ইনছাফ জ্ঞান ও কীর্তির দিক থেকে সর্বোচ্চ গুণাবলী। যারা কোন দল বা গোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ত তারা যদি দলীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে উঠে নির্ভেজাল জ্ঞানগত চিন্তা-চেতনার ভিত্তিতে আহলেহাদীছদের নীতি ও আদর্শকে বুঝার চেষ্টা করেন তাহ’লে তাদের নিকটে সম্পূর্ণরূপে সুস্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এ নীতি কিতাব ও সুন্নাহর দলীল সমূহের উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু যদি কোন ব্যক্তি চক্ষু বন্ধ করে এবং কর্ণকুহরে আঙ্গুল প্রবিষ্ট করে ফায়ছালা করার জন্য বসেন তাহ’লে এমন ব্যক্তির নিকট থেকে কি হক ও ইনছাফ আশা করা যায়?

মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা, তিনি আমাদেরকে জ্ঞান ও ইনছাফের সাথে ফায়ছালা করার তেŠফীক দিন এবং আমাদের জ্ঞানে দূরদৃষ্টি এবং ঈমান ও আমলে অবিচলতা দান করুন! আর আমাদেরকে আমৃত্যু ছিরাতে মুস্তাক্বীমের উপরে অটল রাখুন।- আমীন!

[1]. আহমাদ হা/১২৫৭১, ছহীহুল জামে‘ হা/১১৯, হাসান

[2]. ইবনু মাজাহ হা/৩৭৬১; ছহীহুল জামে‘ হা/১৫৬৯, ছহীহ

[3]. বুখারী হা/৬১০৪; মুসলিম হা/৯১

[4]. মুসলিম হা/৯২

[5]. ছহীহ ইবনে হিববান হা/২৪৮; ছহীহ তারগীব হা/২৭৭৫

[6]. আহমাদ হা/২১৯৪৭; তিরমিযী হা/২১৮০; যিলালুল জান্নাহ হা/৭৬।

[7]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১২/১৮০

আহলে হাদীছ জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা (৭ম কিস্তি)

field-meadow-flower-pink.png

আহলেহাদীছ জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা (৭ম কিস্তি)

মূল (উর্দূ) : মাওলানা আবু যায়েদ যমীর
ভারতের প্রখ্যাত আহলেহাদীছ আলেম।
অনুবাদ : তানযীলুর রহমান
শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়া, রাজশাহী।

ভুল ধারণা-৮ :

আহলেহাদীছগণ উম্মতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত (ইজমায়ে উম্মত) মানেন না :

আহলেহাদীছদেরকে ভ্রান্ত প্রমাণ করার চেষ্টায় একথাও বলা হয় যে, আহলেহাদীছরা উম্মতের ইজমা বা সর্বসম্মত সিদ্ধান্তকে মানেন না। কিন্তু সাধারণত এ ব্যাপারে উচ্চবাচ্যকারীরা ইজমা-এর সংজ্ঞাই জানেন না। কখনো তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ইজমা আখ্যা দেন। আবার কখনো সাধারণ মানুষের মাঝে প্রচলিত আমলকে ইজমা বলেন। কোন কোন ইজমার দাবী তো শুধু দাবীই হয়ে থাকে। যখন বাস্তবে তাহক্বীক্ব করা হয়, তখন স্বয়ং সালাফ বা পূর্বসূরীদের মাঝে এ ব্যাপারে মতানৈক্য পাওয়া যায়। এমনকি খোদ ইজমার দাবীদারদের জামা‘আতের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গও এ ধরনের ইজমার প্রতিবাদ করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়।

১. আহলেহাদীছদের নিকটে প্রমাণিত ইজমা সত্য :

বাস্তবতা এই যে, কুরআন ও সুন্নাহ্র পরে খোদ ইজমাও আহলেহাদীছদের নিকট দলীল ও শারঈ প্রমাণ। কিন্তু শর্ত এই যে, সেই ইজমা যেন স্রেফ ধারণা বা নিছক দাবী না হয়। বরং তা যেন একটি প্রমাণিত ইজমা হয়।

আলেহাদীছদের নিকটে ইজমায়ে উম্মত স্বয়ং একটি দলীল। কারণ আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদের পথের বিরোধিতা করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে আখ্যা দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا- ‘সুপথ স্পষ্ট হওয়ার পর যে ব্যক্তি রাসূলের বিরোধিতা করে এবং মুমিনদের বিপরীত পথে চলে, আমরা তাকে ঐদিকেই ফিরিয়ে দেই যেদিকে সে যেতে চায় এবং তাকে আমরা জাহান্নামে প্রবেশ করাবো। আর সেটা হ’ল নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল’ (নিসা ৪/১১৫)

… রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,إِنَّ اللهَ تَعَالَى لَا يَجْمَعُ أُمَّتِيْ عَلَى ضَلَالَةٍ- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা আমার উম্মতকে ভ্রষ্টতার উপর ঐক্যবদ্ধ করবেন না’।[1] অর্থাৎ এমনটা হ’তে পারে না যে, সমগ্র উম্মত একটি ভুল কথাকে ঠিক মনে করতে শুরু করবে।[2]…

২. অনেক ইজমার দাবীর বাস্তবতা স্রেফ ধারণা হয়ে থাকে :

আহলেহাদীছগণ ইজমা মানেন। কিন্তু ইজমার সব দাবী কী বিনা দলীলে বা তাহক্বীক্ব ছাড়াই মেনে নেওয়া যায়? না, যায় না প্রকৃত ব্যাপার হ’ল এই যে, বহু লেখক ও বক্তা কোন কোন মাসআলায় ইজমার দাবী করে থাকেন। কিন্তু যখন প্রকৃতপক্ষে তাহক্বীক্ব করা হয় তখন সেসব মাসআলায় বিদ্বানদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। সেকারণ ইমাম আহমাদ (রহঃ) বলেছেন,مَنِ ادَّعَى الْاِجْمَاعَ فَهُوَ كَذِبٌ لَعَلَّ النَّاسَ قَد اخْتَلَفُوْا- ‘যে ইজমার দাবী করে সে মিথ্যুক। কারণ সম্ভবত মানুষেরা সে ব্যাপারে মতভেদ করেছে’।[3]

আর একথা জানা যে, একজন মুজতাহিদও যদি সেই ঐক্যমত থেকে পৃথক থাকেন তাহ’লে ইজমা কায়েম হয় না। মতভেদের সময় ফায়ছালা কম বা বেশী ভিত্তিতে নয়। বরং কুরআন ও সুন্নাহ্র অনুকূলে হওয়ার ভিত্তিতে করা হয়। এজন্য কোন বিতর্কিত মাসআলায় কোন কোন আলেমের স্বীয় অবস্থানকে প্রমাণ করার জন্য শুধু ইজমার দাবী করাটা মাকড়শার জালের চেয়ে বেশী  মর্যাদা রাখে না।

৩. প্রবক্তার আধিক্য আহলেহাদীছদের নিকট দলীল নয় :

কোন কোন আলেম বিশেষ করে সাধারণ আলেম নিজের ধারণা অনুপাতে সংখ্যাধিক্যকে ইজমা মনে করে অন্যদেরকে নিজের মতে মানানোর জন্য যিদ করতে থাকেন। অথচ ইজমা ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আবার এ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বৈশ্বিক সংখ্যাগরিষ্ঠতাও হয় না। বরং স্রেফ আঞ্চলিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হয়ে থাকে।

বাস্তবতা এই যে, একজন মানুষ তার পসন্দনীয় বিষয়কে সাব্যস্ত করতে যখন উঠেপড়ে লাগে, তখন সে ভিত্তিহীন বিষয় সমূহকে সত্য এবং ধারণাকে দলীল আখ্যা দিতে শুরু করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَنْ سَبِيلِ اللهِ إِنْ يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَخْرُصُونَ ‘অতএব যদি তুমি জনপদের অধিকাংশ লোকের কথা মেনে চল, তাহ’লে ওরা তোমাকে আল্লাহ্র পথ থেকে বিচ্যুত করবে। তারা তো কেবল ধারণার অনুসরণ করে এবং তারা তো কেবল অনুমান ভিত্তিক কথা বলে’ (আন‘আম ৬/১১৬)

বুঝা গেল যে, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতা সর্বদা হকের উপরে থাকে’ এটি কোন কুরআনী নিয়ম নয়। বরং কুরআন তো স্বয়ং এমন লোকদের নিন্দা করছে যারা এ ধরনের মূলনীতিকে আপন করে নিয়েছে। এরূপ মূলনীতি মানুষের বিপথগামী হওয়ার নিশ্চিত কারণ হ’তে পারে। কেননা হকপন্থী কখনো বেশী আবার কখনো কম হয়ে থাকে। বরং সাধারণত হকের অনুসারীরা কমই হয়ে থাকে। ফুযায়ল বিন ইয়ায (রহঃ) বলেন, لَا تَسْتَوْحِشْ طُرُقَ الْهُدَى لِقِلَّةِ أَهْلِهَا، وَلَا تَغْتَرَّ بِكَثْرَةِ الْهَالِكِينَ- ‘তুমি হেদায়াতের রাস্তায় চলমান লোকের সংখ্যা নগণ্য দেখে হতাশাগ্রস্থ হবে না এবং ধ্বংসপ্রাপ্তদের সংখ্যাধিক্যতার ধোঁকায় পড়বে না’।[4] সেকারণ সংখ্যাধিক্যের অনুসরণ করা মানুষের জন্য বড় ধোঁকাও হ’তে পারে। কারণ ধ্বংসপ্রাপ্তদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হ’তে পারে। একটি হাদীছ থেকে এ কথা আরো সুস্পষ্ট হয়ে যায়।

৪. অধিকাংশ মানুষ ভুলের উপর থাকতে পারে :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,بَدَأَ الْإِسْلَامُ غَرِيبًا، وَسَيَعُودُ كَمَا بَدَأَ غَرِيبًا، فَطُوبَى لِلْغُرَبَاءِ ‘ইসলাম নিঃসঙ্গভাবে যাত্রা শুরু করেছিল। সত্বর সেই অবস্থায় ফিরে যাবে। অতএব সুসংবাদ হ’ল সেই অল্পসংখ্যক লোকদের জন্য’।[5] অন্য বর্ণনায় রয়েছে, فَقِيلَ: مَنِ الْغُرَبَاءُ يَا رَسُولَ اللهِ؟ قَالَ: أُنَاسٌ صَالِحُونَ، فِي أُنَاسِ سُوءٍ كَثِيرٍ، مَنْ يَعْصِيهِمْ أَكْثَرُ مِمَّنْ يُطِيعُهُمْ-  ‘জিজ্ঞেস

করা হ’ল, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! অল্পসংখ্যক কারা? তিনি বললেন, অনেক মন্দ লোকের মধ্যে এরা কিছু সৎ মানুষ হবে। তাদের কথা  মান্যকারীর তুলনায়  বিরুদ্ধাচরণকারীদের সংখ্যা

বেশী হবে’।[6]

এ হাদীছ থেকে শেষ যামানার অবস্থা সম্পর্কে জানা গেল যে, পরবর্তী যুগে হকপন্থীদের সংখ্যা কম হবে এবং বাতিলপন্থীদের সংখ্যা বেশী হবে। হকপন্থীদের কথা মান্যকারী মানুষ কম হবে এবং বিরোধিতাকারীদের সংখ্যা বেশী হবে।

যারা সংখ্যাগরিষ্ঠতাকেই হক মনে করে তাদের নিকট প্রশ্ন হ’ল, হকপন্থীদের স্বল্পতা কি সত্যকে মিথ্যা বানিয়ে দেয়? না, হক হকই থাকে। চাই মান্যকারী কম হোক বা বেশী। এজন্য শুধুমাত্র মানুষের সংখ্যাকে হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্যের মানদন্ড নির্ধারণ করা নিজেদেরকে এবং অন্য মানুষদেরকে গোমরাহীর মধ্যে নিপতিত করার সুনিশ্চিত মাধ্যম।       [চলবে]

[1]তিরমিযী হা/২১৬৭; ছহীহুল জামে হা/১৮৪৮

[2]এর অর্থ ছাহাবীগণের ইজমা। যেমন কুরআন সংকলন ও অন্যান্য।

[3]মাসায়েলে ইমাম আহমাদ, পৃঃ ৪৩৮-৩৯, মাসআলা নং ১৫৮৭

[4]আল-আদাবুশ শারঈয়্যাহ ১/২৬

[5]মুসলিম হা/২০৮ ‘ঈমান’ অধ্যায়

[6]আহমাদ হা/৬৬৫০; ছহীহুল জামে হা/৩৯২১; ছহীহাহ হা/১৬১৯

আহলে হাদীস জামাআতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা (৬ষ্ঠ কিস্তি)

images.png

আহলেহাদীছ জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা (৬ষ্ঠ কিস্তি)

মূল (উর্দূ) : মাওলানা আবু যায়েদ যমীর
ভারতের প্রখ্যাত আহলেহাদীছ আলেম।
অনুবাদ : তানযীলুর রহমান
শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়া, রাজশাহী।

ভুল ধারণা-৭ :

আহলেহাদীছদের দাওয়াতের উদ্দেশ্য মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করা :

সব মতভেদ কি মন্দ? না, বরং সেই মতভেদ মন্দ, যা হকের বিরোধিতায় করা হয়। হকের বিরোধিতা করা গোমরাহী। কিন্তু বাতিলের বিরোধিতা করা ফরয। ইসলাম এটা শিক্ষা দেয় না যে, আপনি সঠিককে ভুল এবং বেঠিককে সঠিক বলবেন। যদি এ নীতি অবলম্বন করা হয় তাহ’লে সমাজ থেকে অন্যায় কর্ম নিষেধ করার আমল শেষ হয়ে যাবে। এমনকি ভুল ও সঠিকের পার্থক্যও ঘুচে যাবে। সেকারণ ভুল কথাগুলির খন্ডন করা যরূরী। চাই সে ভুল গোমরাহী হোক অথবা জ্ঞানগত ভুল হোক।

(১) আহলেহাদীছদের নিকটে নিন্দিত মতভেদ সেটা, যা হকের মোকাবিলায় করা হয় :

আসল মন্দ হ’ল হকের সাথে মতভেদ। সত্য প্রকাশিত হওয়ার পর তা অস্বীকার করা অথবা তার বিরোধিতা করা এবং হকপন্থীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের একটা দল তৈরী করা আল্লাহর নিকট শাস্তি পাওয়ার মত উপযুক্ত একটি কাজ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ- ‘তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং স্পষ্ট প্রমাণাদি এসে যাওয়ার পরেও তাতে মতভেদ করেছে। এদের জন্য রয়েছে ভয়ংকর শাস্তি’ (আলে ইমরান ৩/১০৫)

বুঝা গেল যে, সত্য প্রকাশিত হওয়ার পর তার অনুসরণ করার পরিবর্তে নিজের যিদের উপর অটল থাকা এবং আপোসে ঝগড়া-বিবাদ করা সব মন্দের মূল।

কিন্তু ঐক্যের দোহাই দিয়ে একে অপরের ধর্মীয় ভুল-ত্রুটিগুলি এড়িয়ে যাওয়া এবং সংশোধনের জন্য মুখ না খোলা ঠিক নয়। কারণ শুধু ঐক্য উদ্দেশ্য নয়, চাই সেই ঐক্য সঠিক জিনিসের উপর হোক অথবা ভুল জিনিসের উপর। বরং আসল লক্ষ্য হ’ল মুসলমানদের সত্যের উপরে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। এজন্য দলীল দ্বারা সাব্যস্ত সত্যের উপরে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য শান্তিপূর্ণ উপায়ে সঠিক কথা বলা যরূরী। এ দায়িত্ব পালন না করলে আলেম সমাজ দায়মুক্ত হ’তে পারেন না।

(২) উম্মতের মতভেদের সময়ে সুন্নাতের অনুসরণেই মুক্তি রয়েছে :

নবী করীম (ছাঃ) পরবর্তী যুগে উম্মতের মাঝে সৃষ্ট মতভেদ সম্পর্কে পূর্বেই অবহিত করেছিলেন। তিনি সে সময় এ কথা বলেননি যে, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ মতের উপরে অটল থেকে ঐক্য বজায় রাখবে। বরং উম্মতের মতভেদের এ যুগে তিনি তাঁর ও স্বীয় হেদায়াতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের পথ গ্রহণ করার তাকীদ করেছিলেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন,

مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ بَعْدِى فَسَيَرَى اخْتِلاَفًا كَثِيرًا فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِى وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الْمَهْدِيِّينَ الرَّاشِدِينَ تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ

‘আমার মৃত্যুর পর তোমাদের মধ্যে যারা জীবিত থাকবে তারা অনেক মতভেদ দেখতে পাবে। তখন তোমরা আমার ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে ধারণ করবে। তোমরা সেগুলি কঠিনভাবে অাঁকড়ে ধরবে এবং মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরবে। আর তোমরা ধর্মের নামে নতুন সৃষ্টি করা হ’তে বিরত থাকবে। কেননা প্রত্যেক নতুন সৃষ্টিই বিদ‘আত এবং প্রত্যেক বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা’।[1]

যদি বাস্তবে চিন্তা করা যায় তবে দেখা যাবে যে, নিজের মতকে দ্বীন আখ্যা দিয়ে এর উপরে গো ধরা এবং নিজের ইচ্ছামত দ্বীনে পরিবর্তন করাই মতভেদের মূল কারণ।

(৩) উম্মতের মতভেদের সময় সুন্নাতকে অাঁকড়ে ধরা সহজ কাজ নয় :

পরবর্তী যুগে অনৈক্য এত ব্যাপক আকার ধারণ করবে যে, উম্মতের মাঝে মতভেদের সময় সেই মতভেদ দূর করার জন্য নববী সমাধানের দিকে প্রত্যাবর্তন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। মানুষ ফেরকাবাযী ও দলীয় গোড়ামির চশমা পরে সমস্যার সমাধান করবে। এমন সময় কুরআন ও সুন্নাহকে অন্য সব কিছুর উপরে অগ্রাধিকার দানকারীদেরকে তীব্র বিরোধিতা ও দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন হ’তে হবে। আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,اَلْمُتَمَسِّكُ بِسُنَّتِيْ عِنْدَ اخْتِلَافِ أُمَّتِيْ كَالْقَابِضِ عَلَى الْجَمْرِ- ‘আমার উম্মতের মতভেদের সময় আমার সুন্নাতকে অাঁকড়ে ধারণকারীদের অবস্থা এমন হবে, যেমন জ্বলন্ত অঙ্গার ধারণকারীর অবস্থা হয়’।[2]

(৪) অপসন্দনীয় হ’লেও আহলেহাদীছদের নিকট সত্য কথা বলা যরূরী :

মানুষের শত্রুতা ও অসন্তুষ্টির ভয়ে হক কথা গোপন করা মানুষকে জনগণের মাঝে সস্তা খ্যাতি, গ্রহণযোগ্যতা এবং সাময়িক নিরাপত্তা দিতে পারে, কিন্তু তা আল্লাহ তা‘আলার নিকট মানুষের নিকট হক প্রকাশ করার দায়িত্ব থেকে তাকে মুক্তি দিতে পারে না। রাসূল (ছাঃ) বলেন,أَلَا لَا يَمْنَعَنَّ رَجُلًا هَيْبَةُ النَّاسِ أَنْ يَقُولَ بِحَقٍّ إِذَا عَلِمَهُ ‘খবরদার! হক জানার পর মানুষের ভয় তা প্রকাশ করা থেকে যেন কোন ব্যক্তিকে বিরত না রাখে’।[3]

(৫) অন্যায়-অপকর্মের বিরুদ্ধে কথা বলা যরূরী :

আল্লাহর নবী (ছাঃ) পরবর্তী যুগের হকপন্থীদের এই বিশেষ ফযীলত বর্ণনা করেছেন যে, তারা মানুষকে ভুল বিষয় থেকে নিষেধ করবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,إِنَّ مِنْ أُمَّتِيْ قَوْمًا يُعْطَوْنَ مِثْلَ أُجُوْرِ أَوَّلِهِمْ فَيُنْكِرُوْنَ الْمُنْكَرَ ‘আমার উম্মতের মাঝে এমন কিছু মানুষ বিদ্যমান থাকবে যাদেরকে পূর্ববর্তীদের মত পুরস্কার দেওয়া হবে। তারা ঐ সকল লোক যারা অন্যদেরকে মন্দ থেকে নিষেধ করবে’।[4]

খোলা কথা হ’ল নিষেধ করার পর কিছু লোক তাদের কথা মানবে এবং কিছু লোক মানবে না। যার ফলে মতানৈক্য দেখা দিবে। কিন্তু শুধু মতভেদ দেখা দেওয়ার ভয়ে মন্দের বিরোধিতা ছেড়ে দেয়া নববী নীতি ও দাওয়াতী হিকমতের সরাসরি বিরোধী।

(৬) দ্বীনী ইলম সমূহকে কুসংস্কারের জাল থেকে পবিত্র করা যরূরী :

আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বলেন, يَحْمِلُ هَذَا الْعِلْمَ مِنْ كُلِّ خَلَفٍ عُدُولُهُ يَنْفُونَ عَنْهُ تَحْرِيفَ الْغَالِينَ وَانْتِحَالَ الْمُبْطِلِينَ وَتَأْوِيلَ الْجَاهِلِيْنَ  ‘পরবর্তীদের  মধ্য  থেকে  এমন  মানুষ এ ইলমের ধারক ও বাহক হবেন, যারা হবেন ন্যায়পরায়ণ। তারা সীমালংঘনকারীদের পরিবর্তন, মিথ্যা দাবীদারদের অভিযোগ  এবং মূর্খদের অপব্যাখ্যা থেকে এ ইলমকে পবিত্র করবেন’।[5]

এ হাদীছ থেকে এটাও জানা গেল যে, দ্বীনকে পরিবর্তন-পরিবর্ধন ও অপব্যাখ্যা থেকে নিরাপদ রাখার জন্য ভুলের প্রতিবাদ করা যরূরী। অন্যথায় দ্বীনের আসল শিক্ষা সমূহ কুসংস্কার ও রসম-রেওয়াজের পর্দার পিছে আত্মগোপন করে থাকবে। এজন্য হকপন্থীরা সর্বদা দ্বীনের হেফাযতের এ দায়িত্ব পালন করে আসছেন এবং ভবিষ্যতেও পালন করতে থাকবেন। অনুরূপভাবে যারা বিপথগামী হওয়া সত্ত্বেও নিজেদেরকে হকপন্থী প্রমাণ করতে তৎপর রয়েছে এবং উম্মতের সরল-সিধা মানুষদেরকে স্বীয় প্রতারণাপূর্ণ কথার ফাঁদে ফেলে তাদেরকে নিজেদের দুনিয়া কামানোর মাধ্যম বানিয়েছে, এমন লোকদের স্বরূপ উন্মোচন করা শুধু হকের প্রতিরক্ষাই নয়; বরং উম্মতের কল্যাণকারিতার অন্যতম দাবীও বটে। সেকারণ আহলেহাদীছদের বক্তৃতা ও লেখনী সমূহে যেমন দ্বীনে হকের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও কল্যাণের প্রতি উৎসাহ থাকে, তেমন বাতিল ও বাতিলপন্থীদের খন্ডনও থাকে। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে কোন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির পক্ষ থেকেও কোন মাসআলায় জ্ঞানগত ভুল হয়ে গেলে সেটাকেও দ্বীনের হেফাযত এবং হক প্রকাশের জাযবায় আহলেহাদীছরা তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দেন। এতে কোন ব্যক্তির খন্ডন উদ্দেশ্য থাকে না। বরং আসল লক্ষ্য থাকে হক প্রকাশ করা। আসলে আহলেহাদীছদের নিকটে হকের স্থান ব্যক্তির অনেক ঊর্ধ্বে।

[চলবে

[1]আহমাদ হা/১৭১৮৪; আবূদাঊদ হা/৪৬০৭; তিরমিযী হা/২৬৭৬; ইবনু মাজাহ হা/৪৩; ছহীহুল জামে‘ হা/২৫৪৯

[2]ছহীহুল জামে‘ হা/৬৬৭৬, সনদ হাসান

[3]ইবনু মাজাহ হা/৪৩৪৪

[4]আহমাদ হা/১৬৬৪৩; ছহীহুল জামে হা/২২২৪

[5]বায়হাকীা/২০৯১১; মিশকাত হা/২৪৮

আহলেহাদীছ জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা (৫ম কিস্তি)

allgau-560071__340 (1).png

আহলে হাদীছ জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা (৫ম কিস্তি)

মূল (উর্দূ) : মাওলানা আবু যায়েদ যমীর
ভারতের প্রখ্যাত আহলেহাদীছ আলেম।
অনুবাদ : তানযীলুর রহমান
শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়া, রাজশাহী।

ভুল ধারণা-৬ :

আহলেহাদীছরা আলেমদেরকে মানে না :

তাক্বলীদে শাখছী থেকে আহলেহাদীছদের দূরে থাকাকে অনেকে আলেমদের প্রতি অসন্তুষ্টির সমার্থবোধক বানিয়ে দেন। তারা এটা মনে করেন যে, আহলেহাদীছরা যেখানে চার ইমামেরই তাক্বলীদ করে না সেখানে অন্য আলেমদের কিভাবে মানতে পারে? অথচ এটা সত্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। আহলেহাদীছরা কোন আলেমের ব্যক্তিত্ব বা তার কথাকে নবী করীম (ছাঃ)-এর ন্যায় অনুসরণ করা আবশ্যক মনে করেন না। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা আলেমদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে থাকেন। দ্বীনের মাসআলা-মাসায়েল বুঝতে আলেমদের নিকট থেকে উপকৃত হওয়া এবং তাঁদের দিকনির্দেশনা গ্রহণ করাকে তারা যরূরী মনে করেন।

(১) আহলেহাদীছরা জানা না থাকার ক্ষেত্রে আলেমদের খেদমত থেকে উপকার লাভ করে থাকেন : স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা জানা না থাকলে আলেমদের নিকট থেকে উপকৃত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, فَاسْأَلُوْا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ، ‘যদি তোমাদের জানা না থাকে তাহ’লে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস কর’ (নাহল ১৬/৪৩; আম্বিয়া ২১/৭)। এ আয়াত থেকে বিদ্বানগণ এ কথার দলীল গ্রহণ করে থাকেন যে, যার জানা নেই সে যেন জ্ঞানী ব্যক্তির দারস্থ হয় এবং তার নিকট থেকে জেনে স্বীয় জ্ঞান বৃদ্ধি করে।

(২) দুনিয়া থেকে আলেমদের উঠিয়ে নেওয়া মানুষদের গোমরাহীর এক বড় কারণ :

আলেমদের জীবিত থাকা উম্মতের জন্য গোমরাহী থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যম। অপরপক্ষে আলেমদের শূন্যতা ভ্রষ্টতা ও ধ্বংসের কারণ। আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,إِنَّ اللهَ لاَ يَنْزِعُ العِلْمَ بَعْدَ أَنْ أَعْطَاكُمُوْهُ انْتِزَاعًا، وَلَكِنْ يَنْتَزِعُهُ مِنْهُمْ مَعَ قَبْضِ العُلَمَاءِ بِعِلْمِهِمْ، فَيَبْقَى نَاسٌ جُهَّالٌ، يُسْتَفْتَوْنَ فَيُفْتُوْنَ بِرَأْيِهِمْ، فَيُضِلُّوْنَ وَيَضِلُّوْنَ، ‘আল্লাহ তোমাদেরকে যে ইলম দান করেছেন তা হঠাৎ ছিনিয়ে নেবেন না। বরং আলেমদেরকে তাদের ইলমসহ ক্রমশঃ তুলে নেয়ার মাধ্যমে তা ছিনিয়ে নেবেন। তখন কেবল মূর্খ লোকেরা অবশিষ্ট থাকবে। তাদের কাছে ফৎওয়া চাওয়া হ’লে তারা মনগড়া ফৎওয়া দেবে। ফলে নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করবে’।[1]

এ হাদীছের ভিত্তিতে আহলেহাদীছরাও এ আক্বীদা পোষণ করেন যে, আলেম-ওলামার বিদ্যমানতা উম্মতের কল্যাণ ও হেদায়াতের কারণ। আলেম-ওলামার অনুপস্থিতি অযোগ্য ব্যক্তিদের ফৎওয়াবাযী করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিবে। যা স্বয়ং তাদের ও অন্যদের পথভ্রষ্ট হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। সেকারণ সর্বদা আলেমদের সাহচর্যে থাকতে হবে।

(৩) আহলেহাদীছরা স্বীয় প্রবৃত্তিপূজার নিন্দা করেন[2] :

কোন কোন মানুষের এ ভ্রান্ত ধারণা আছে যে, আহলেহাদীছদের দাওয়াতের উদ্দেশ্য হ’ল সাধারণ মানুষকে আলেমদের নিকট থেকে মুক্ত করে প্রবৃত্তিপূজার পথে পরিচালিত করা। অথচ এ অভিযোগকারীদের মধ্যে অবশ্যই কেউ এমন আছেন যিনি জানেন যে, আহলেহাদীছদের মাঝে আলেম ও জনসাধারণ উভয়েই রয়েছে, যারা আলেমদের নিকট থেকে মাসআলা জিজ্ঞাসা করে তদনুযায়ী আমল করে। সারা পৃথিবীতে আহলেহাদীছদের বড় বড় মাদরাসা এবং বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেখান থেকে প্রতিবছর শত-সহস্র ছাত্র সনদ লাভ করে দ্বীনের খেদমতের জন্য সমাজের অংশ হয়ে যায়।

আহলেহাদীছদের দাওয়াত কখনো এটা নয় যে, জনসাধারণকে আলেমদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে তাদেরকে মুজতাহিদের আসনে আসীন করা। বরং আহলেহাদীছদের দাওয়াত এই যে, সাধারণ মানুষকে এমন জ্ঞানের দিকে প্রত্যাবর্তন করানো, যা আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) নিয়ে এসেছেন। তাদের দাওয়াত হ’ল জনসাধারণের মাঝে এ চেতনা সৃষ্টি করা যে, তারা মাযহাবী গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে উঠে হক-কে মান্যকারী হবেন। চাই হক পেশকারী বিরোধী দলের লোক-ই হোন না কেন। আহলেহাদীছের দাওয়াত হ’ল বাপ-দাদা, পূর্ব-পুরুষ, সমাজ ও প্রবৃত্তির ঊর্ধ্বে উঠে উম্মতের মাঝে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর কথা মেনে নেওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করা। এমনকি গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝা যায় যে, আসল প্রবৃত্তিপূজা তো এটাই যে, বাপ-দাদা, সমাজ ও মাযহাবী গোঁড়ামির কারণে মানুষ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথা মেনে নেওয়া থেকে দূরে থাকবে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,فَإِنْ لَمْ يَسْتَجِيْبُوْا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُوْنَ أَهْوَاءَهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِنَ اللهِ- ‘অতঃপর যদি তারা তোমার কথায় সাড়া না দেয় তবে জানবে যে, তারা কেবল তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে। আর যে ব্যক্তি আললাহর হেদায়াত অগ্রাহ্য করে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তার চাইতে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে আছে?’ (ক্বাছাছ ২৮/৫০)

অর্থাৎ যদি মানুষ আল্লাহর রাসূলের ডাকে সাড়া না দেয়, তাঁর কথা না মানে এমনকি শুনতে আগ্রহীও না হয় তাহ’লে এটা তার প্রবৃত্তিপূজার প্রমাণ বৈকি। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত হেদায়াত ও পথনির্দেশনা উপেক্ষা করে স্রেফ ধারণা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করা সবচাইতে বড় গোমরাহী। যে ব্যক্তি আল্লাহ প্রদত্ত দিকনির্দেশনার বিরোধিতা করবে, তার সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হওয়া ও অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ থাকতে পারে কি?

আহলেহাদীছদের দৃষ্টিতে, আলেম-ওলামার নিকট থেকে সরে যাওয়া যেমন গোমরাহীর কারণ, তেমনি আলেমদের ফৎওয়া সমূহের মধ্য থেকে নিজের ইচ্ছামত ফৎওয়া তালাশ করে তার উপর আমল করাও গোমরাহী। এ ধরনের ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে আলেমদের কথার অনুসরণকারী হিসাবে নিজেকে যাহির করলেও আসলে সে স্বীয় প্রবৃত্তির দাস হয়ে থাকে। সুলায়মান তায়মী (৪৬-১৪৩ হিঃ) বলেন, إِنْ أَخَذْتَ بِرُخْصَةِ كُلِّ عَالِمٍ اجْتَمَعَ فِيكَ الشَّرُّ كُلُّهُ ‘যদি তুমি সব আলেমের রুখছত তথা শিথিল ফৎওয়াগুলো গ্রহণ কর তাহ’লে তোমার মধ্যে সব অকল্যাণ একত্রিত হবে’।[3]

ইবনু আব্দিল বার্র বলেন, هَذَا إِجْمَاعٌ لَا أَعْلَمُ فِيْهِ خِلَافًا ‘এ কথার উপর ইজমা হয়েছে। আমার জানা মতে এ ব্যাপারে কারো মধ্যে কোন দ্বিমত নেই’।[4]

নিজের খায়েশ পূরণ করার জন্য আলেমদের কথার উপর নির্ভর করাকে জ্ঞানের পরিবর্তে মূর্খতা ও কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণ বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত। সব ধরনের প্রবৃত্তিপূজা থেকে বেঁচে থাকা এবং কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী হওয়াই আহলেহাদীছদের দাওয়াতের মূল কথা।

(৪) কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মতভেদের ফায়ছালা হওয়া উচিত :

এখানে একথাও ভাবার দাবী রাখে যে, যারা আলেমদের কথা মানার উপর জোর দেন এবং আহলেহাদীছদেরকে আলেমদের দুশমন সাব্যস্ত করার অপচেষ্টা চালান, তারা কি সকল আলেমের কথা মানেন? এক মাযহাবের হওয়া সত্ত্বেও কোন কোন সময় সেই মাযহাবের সাথে সম্পৃক্ত দু’দলের আলেমদের মধ্যে এত মারাত্মক মতভেদ দেখা দেয় যে, ব্যাপারটা একে অপরকে গোমরাহ এমনকি কাফের আখ্যা দেয়া পর্যন্ত গড়ায়। এমতাবস্থায় প্রত্যেক দলের আলেমগণ তাদের অনুসারীদেরকে অপর দলের আলেমদের বাধা দেন। তারা নিজেদের এ ধরনের কর্মপদ্ধতিকে আলেমদেরকে অসম্মান করা বা তাদের বিরোধিতা আখ্যা দেয় না। তাদের নিকটে আলেমদের কথা মেনে নেয়ার মূলনীতি শুধুমাত্র নিজ জামা‘আত বা দলের আলেমদের পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে। পক্ষান্তরে আহলেহাদীছরা কোন আলেমের মতামতকে শুধুমাত্র দলীয় গোঁড়ামির কারণে প্রত্যাখ্যান করে না; বরং কিতাব ও সুন্নাতের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়া অথবা দলীল বিহীন হওয়ার কারণে পরিত্যাগ করে। আর এটা স্বয়ং ঈমানের দাবী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর এবং আনুগত্য কর রাসূলের ও তোমাদের নেতৃবৃন্দের। অতঃপর যদি কোন বিষয়ে তোমরা বিতন্ডা কর, তাহ’লে বিষয়টি আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও। যদি তোমরা আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। এটাই কল্যাণকর ও পরিণতির দিক দিয়ে সর্বোত্তম’ (নিসা ৪/৫৯)

এ আয়াত থেকে দলীল গ্রহণ করতে গিয়ে কোন কোন আলেম এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, আলেমদের কথা মানা আবশ্যক। কেননা স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা এর নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু তিনি একথা বলেন না যে, এ আয়াতে আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের আনুগত্যের নির্দেশ উলুল আমর (নেতাদের)-এর পূর্বে এবং আলাদাভাবে দেয়া হয়েছে। উলুল আমর-এর কথা কি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর অগ্রগণ্য? আলেমরা কি কিতাব ও সুন্নাতের চেয়ে অগ্রগামী? আয়াতে তো আলেমদেরকে স্বয়ং দলীলও আখ্যা দেয়া হয়নি। বরং মতভেদের সময়ে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সমস্যার সমাধান করতে বলা হয়েছে। যদি আলেমদের কথা স্বয়ং দলীল হ’ত তাহ’লে সেটিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে ফিরানোর প্রয়োজন হ’ত না। বুঝা গেল যে, আলেমদের কথা মানার হুকুম সে সময় প্রযোজ্য হবে, যখন তা কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক হবে। আলাদাভাবে নয়। কারণ আলেম নিজে কোন দলীল নন। বরং তিনি দলীলের মুখাপেক্ষী।

(৫) আহলেহাদীছগণ শরী‘আতের মোকাবিলায় কোন আলেমের কথা মানেন না :

যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার অহীর মোকাবিলায় আলেমদের কথাকে মেনে নেয় অথবা আলেমদেরকে বস্ত্তসমূহকে হালাল বা হারাম আখ্যা দেওয়ার এখতিয়ার দিয়ে দেয়, তাহ’লে এটা তাদেরকে রব বা মা‘বূদের স্থানে বসানোর নামান্তর। আদী বিন হাতেম বলেন,أَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَفِي عُنُقِي صَلِيبٌ فَقَالَ لِي: يَا عَدِيَّ بْنَ حَاتِمٍ: أَلْقِ هَذَا الْوَثَنَ مِنْ عُنُقِكَ- وَانْتَهَيْتُ إِلَيْهِ وَهُوَ يَقْرَأُ سُورَةَ بَرَاءَةٍ حَتَّى أَتَى عَلَى هَذِهِ الْآيَةِ اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللهِ قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ إِنَّا لَمْ نَتَّخِذْهُمْ أَرْبَابًا، قَالَ: بَلَى، أَلَيْسَ يُحِلُّونَ لَكُمْ مَا حُرِّمَ عَلَيْكُمْ فَتُحِلُّونَهُ، وَيُحَرِّمُونَ عَلَيْكُمْ مَا أَحَلَّ اللهُ لَكُمْ فَتُحَرِّمُونَهُ؟ فَقُلْتُ: بَلَى، قَالَ: تِلْكَ عِبَادَتُهُمْ ‘আমি আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে আসলাম। তখন আমার গলায় ক্রুশ ঝুলানো ছিল। তিনি এটা দেখে বললেন, হে আদী! তোমার গলা থেকে এ মূর্তিটি ছুঁড়ে ফেল। আমি তাঁর নিকটবর্তী হ’লে শুনতে পেলাম, তিনি সূরা তওবা পাঠ করছিলেন। এমনকি তিনিاتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ ‘তারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের আলেম-ওলামা ও পোপ-পাদ্রীদের এবং মারিয়াম পুত্র মসীহ ঈসাকে ‘রব’ হিসাবে গ্রহণ করেছে’ (তওবা ৯/৩১) আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলেন। অতঃপর আমি বললাম,  হে আল্লাহর  রাসূল  (ছাঃ)!  আমরা

তো তাদেরকে আমাদের রব বানাইনি। তিনি বললেন, হ্যাঁ অবশ্যই বানিয়েছ। ব্যাপারটা কি এরূপ নয় যে, যখন তারা আল্লাহর হারাম করা কোন বস্ত্তকে তোমাদের জন্য হালাল করে দেন, তখন তোমরা তা হালাল রূপে গ্রহণ কর। আবার যখন তারা আল্লাহ প্রদত্ত হালালকে তোমাদের জন্য হারাম করেন তখন তোমরা সেটাকে তোমাদের জন্য হারাম মনে কর। আমি বললাম, হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, এটাই তাদের ইবাদত’।[5]

অর্থাৎ আল্লাহ প্রদত্ত শরী‘আতের মোকাবিলায় আলেমদের কথা মানা শিরক। মানুষ চাই তাদেরকে মা‘বূদের মর্যাদা দিক বা না দিক। তাদের কথা শরী‘আত বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও তা মেনে নেয়ার অর্থই হ’ল তাদেরকে শরী‘আত প্রণেতা রূপে মেনে নেয়া। আর এটাই হ’ল তাদেরকে রব আখ্যা দেয়া।

[চলবে]

[1]. বুখারী হা/৭৩০৭ ‘কুরআন ও সুন্নাহকে অাঁকড়ে ধরা’ অধ্যায়; মুসলিম হা/৪৮২৮, ৪৮২৯ ‘ইলম’ অধ্যায়

[2]. القضاة ثلاثة : قاضيان في النار و قاض في الجنة قاض قضى بالهوى فهو في النار و قاض قضى بغير علم فهو في النار و قاض قضى بالحق فهو في الجنة- ‘বিচারক তিন শ্রেণীর। দুই শ্রেণীর বিচারক জাহান্নামে এবং এক শ্রেণীর জান্নাতে যাবে। যে বিচারক তার প্রবৃত্তি অনুযায়ী বিচার করবে সে জাহান্নামে যাবে। অনুরূপভাবে যে না জেনে বিচার করবে সেও জাহান্নামে যাবে। আর যিনি হক অনুযায়ী বিচার করবেন তিনি জান্নাতে যাবেন’ (ছহীহুল জামে‘ হা/৪৪৪৭)

[3]. জামেউ বায়ানিল ইলম, ক্রমিক ১০৮৯

[4]. 

[5]. তিরমিযী হা/৩০৯৫; বায়হাকী, আস-সুনানুল কুবরা হ/২০৩৫০; হাদীছ হাসান; জামেউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহি ক্রমিক ১১৪০

আহলে হাদীস জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা (৪র্থ কিস্তি)

Untitled-Project (1).jpg

আহলেহাদীছ জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা (৪র্থ কিস্তি)

মূল (উর্দূ) : মাওলানা আবু যায়েদ যমীর
ভারতের প্রখ্যাত আহলেহাদীছ আলেম।
অনুবাদ : তানযীলুর রহমান
শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়া, রাজশাহী।

ভুল ধারণা-৫ :

আহলেহাদীছগণ ইমাম চতুষ্টয়কে মানেন না এবং তাদেরকে গোমরাহ বলেন :

আহলেহাদীছ সম্পর্কে আরেকটি বিভ্রান্তি হ’ল, তারা ইমাম চতুষ্টয়কে মানে না; বরং তাদের শানে বেয়াদবী করে এবং তাদেরকে গোমরাহ আখ্যায়িত করে। আসুন দেখা যাক এ ব্যাপারে বাস্তবে আহলেহাদীছদের অবস্থান কী?

১. ইমামদের সম্পর্কে আহলেহাদীছদের অবস্থান :

এ ব্যাপারে বর্তমান সময়ের একজন বড় মাপের আহলেহাদীছ আলেম শায়খ ছালেহ আল-ফাওযান (রহঃ) বলেন,وَهَذَا هُوَ الْقَوْلُ الْحَقُّ الْوَسْطُ : نَأْخُذُ مِنْ اَقْوَالِ الْعُلَمَاءِ وَالْفُقَهَاءِ مَا وَافَقَ الدَّلِيْلُ ِمنْ كِتَابٍ وَسُنَّةٍ وَنَتْرُكُ مَا خَالَفَ الدَّلِيْلُ وَنَعْتَذِرُ لِلْعُلَمَاءِ فِيْ خَطْئِهِمْ وَنَعْرِفُ قُدْرَهُمْ وَلَا نَنْتَقِصُهُمْ- ‘সঠিক ও ন্যায়ভিত্তিক মত এটাই যে, আমরা আলেম ও ফক্বীহদের সেই বক্তব্য গ্রহণ করি, যা কুরআন ও হাদীছের দলীল মোতাবেক হয়, আর যা দলীলের সাথে সাংঘর্ষিক তা পরিত্যাগ করি।[1] আমরা আলেমদের ইজতেহাদী ভুলের জন্য তাদেরকে ক্ষমার্হ মনে করি, তাঁদেরকে সম্মান করি। তাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করি না’।[2]

আহলেহাদীছদের নিকটে ইমাম চতুষ্টয় ত্রুটিমুক্ত নন। কিন্তু তাঁরা অবশ্যই সম্মান পাওয়ার যোগ্য। তাঁদের ইলমী অবদান স্বীকার না করা স্বয়ং আল্লাহর অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। কেননা এঁরা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য একটা নে‘মত। তাঁরা এমন সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ, যারা তাদের যুগে কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষাকে ব্যাপকভাবে প্রচার করেছেন এবং আগত বহু জটিল মাসআলায় কুরআন ও সুন্নাহর দলীলগুলোকে গবেষণা করে উম্মতকে পথ প্রদর্শন করেছেন। এসব মহান ব্যক্তির গবেষণা ও ইলমী খেদমতের ফায়েদা স্রেফ তাঁদের যুগ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং পরবর্তী সময়েও উম্মতের জন্য মাসআলা-মাসায়েলে চিন্তা, গবেষণা ও ইজতেহাদ করার পদ্ধতির ব্যাপারে এক আলোকবর্তিকা স্বরূপ। এ সমস্ত মহান ব্যক্তির খেদমতের প্রতি অসম্মান করা বস্ত্তত আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করা। কেননা যে মানুষের শুকরিয়া আদায় করে না সে আল্লাহরও শুকরিয়া আদায় করে না।

চার ইমামের ব্যাপারে আহলেহাদীছদের অবস্থান এই যে, তাদের ইলমী খেদমত থেকে উপকৃত হ’তে হবে। কিন্তু তাঁদের কোন একজনের অনুসারী হয়ে অন্যদের প্রতি গোঁড়ামি করা যাবে না। এরূপ যেন না হয় যে, আমরা একজন ইমামের সমস্ত মত মেনে নিব এবং অন্য তিন ইমামের কোন মতই মানতে প্রস্ত্তত থাকব না। আহলেহাদীছদের নিকট এ ধরনের কর্মপদ্ধতি বেইনছাফী। এরূপ গোঁড়ামির কারণে মানুষ তিন ইমামের রেখে যাওয়া মূল্যবান ইলমী উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। আবার এটা কোথাকার মূলনীতি যে, একজন ইমামের বিপরীতে অন্য তিনজন ইমামের মতামতকে বিনা দলীলে পরিত্যাগ করা হবে?

বিস্ময়ের ব্যাপার হ’ল, আহলেহাদীছ যদি নবী করীম (ছাঃ)-এর কথার বিপরীতে কোন ইমামের কোন একটি কথা মেনে না নেয় তবে তাদেরকে ইমামদের বিরোধিতাকারী বা অস্বীকারকারী এমনকি তাঁদের দুশমন ও তাদের শানে বেয়াদবীকারী হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু একজন গায়ের আহলেহাদীছ ব্যক্তি শুধু স্বীয় ইমামের তাক্বলীদের কারণে এক সাথে তিন তিনজন ইমামের কথা নিঃসংকোচে বাদ দিলেও তাকে ইমামদের শানে না বেয়াদবীকারী বলা হয়, আর না অস্বীকারকারী। বরং সে স্বীয় ইমামের কথা মানার কারণে নবী করীম (ছাঃ)-এর কথার প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করলেও তার দ্বীন ও ঈমানের মধ্যে কোন পার্থক্য সূচিত হয় না।

আহলেহাদীছগণ ইমামদের সেসব কথা মান্য করেন, যার স্বপক্ষে কুরআন ও সুন্নাহর দলীল মওজূদ রয়েছে। আর তারা সেসব কথাকে পরিত্যাগ করেন যা দলীলের সাথে সাংঘর্ষিক হয়। তারা কোন একজন ইমামের সব মতকে মেনে নিয়ে অন্য ইমামদের মতামতকে অগ্রাহ্য করেন না। বরং প্রত্যেকের দালীলিক (প্রমাণপুষ্ট) মতকে মেনে নেন। আর তাঁদের জ্ঞানগত ভুল-ত্রুটির ব্যাপারে সতর্ক করা সত্ত্বেও তাদের শানে বেয়াদবী করা থেকে মুক্ত থাকেন। এমনকি যদি কোন মাসআলায় তাঁদের মত দলীলের বিপরীত বা দুর্বল প্রমাণিত হ’লেও তাদের প্রতি সুধারণা পোষণ করতঃ তাদের জন্য ওযর তালাশ করেন যে, হয়তবা তাঁদের নিকট এ হাদীছ পৌঁছেনি অথবা তাঁরা এর অন্য কোন অর্থ বুঝেছেন অথবা সেটাকে মানসূখ মনে করেছেন অথবা সেটা গ্রহণযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে সন্ধিগ্ধ ছিলেন প্রভৃতি।

২. মুজতাহিদের ফায়ছালায় ভুল ও সঠিক উভয়ের সম্ভাবনা থাকে : এখানে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, একজন বড় মাপের আলেম কিভাবে দ্বীনের বিষয়ে ফায়ছালা করতে গিয়ে ভুল করে বসেন? এর জবাব স্বয়ং নবী করীম (ছাঃ)-এর হাদীছে মওজূদ রয়েছে। আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বলেন,إِذَا حَكَمَ الحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ، وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرٌ- ‘যখন বিচারক ফায়ছালা করতে গিয়ে ইজতেহাদ করে এবং সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়; তাহ’লে তার জন্য দু’টি নেকী রয়েছে। আর যদি সে ফায়ছালা করতে গিয়ে ইজতেহাদ করে ও ভুল করে তাহ’লে তার জন্য এক নেকী’।[3]

উপরোক্ত হাদীছ থেকে দু’টি বিষয় প্রতীয়মান হয়। যথা : (১) কখনো ফায়ছালা করতে মুজতাহিদের ভুল হ’তেও পারে। (২) মুজতাহিদ ইজতেহাদ করার প্রচেষ্টার কারণে ভুল হওয়া সত্ত্বেও একটি নেকী অবশ্যই পাবেন। নবী করীম (ছাঃ)-এর ফরমানের পরে এখন কোন মুমিন এটা বলার দুঃসাহস দেখাতে পারে না যে, মুজতাহিদের ভুল হ’তে পারে না।

(৩) আহলেহাদীছগণ মুজতাহিদের ইজতিহাদী ভুলের ক্ষেত্রে তার আনুগত্য করেন না :

এখানে কোন ব্যক্তির এ বিভ্রান্তিতে পড়া উচিত নয় যে, যে মাসআলায় ভুল হওয়া সত্ত্বেও মুজতাহিদ নেকী পান সেই মাসআলার উপর আমল করে আমরাও নেকী ও পুরষ্কার পাব। সে কারণ আমরা ঠিক করি আর ভুল করি সর্বাবস্থায় নেকীর অধিকারী হব। মুজতাহিদের সাথে কোন মাসআলায় আমাদের মতভেদ করার প্রয়োজন নেই। যদি কোন ব্যক্তি এ ধরনের চিন্তাধারাকে উছূল (মূলনীতি) বানিয়ে ফেলে তাহ’লে এটা তার ভুল। কেননা এ খোশ চিন্তার দুর্গকে তছনছ করার জন্য খলীফা ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-এর ফায়ছালাই যথেষ্ট। ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) বলেন,السُّنَّةُ مَا سَنَّهُ اللهُ وَرَسُولُهُ، لَا تَجْعَلُوْا خَطَأَ الرَّأْيِ سُنَّةً لِلْأُمَّةِ- ‘সুন্নাত (তরীকা) তো সেটাই যা আল্লাহ ও তদ্বীয় রাসূল চালু করেছেন। তোমরা কারো ভুল রায়কে উম্মতের জন্য সুন্নাত হিসাবে নির্ধারণ কর না’।[4]

একথার সমর্থন স্বয়ং কুরআনুল কারীমের এ আয়াত থেকে পাওয়া যায়-وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُمْ بِهِ وَلَكِنْ مَا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ وَكَانَ اللهُ غَفُورًا رَحِيمًا ‘আর পিতৃ পরিচয়ের ব্যাপারে তোমরা কোন ভুল করলে তাতে তোমাদের কোন অপরাধ নেই। কিন্তু তোমাদের অন্তরে দৃঢ় সংকল্প থাকলে অপরাধ হবে। বস্ত্ততঃ আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’(আহযাব ৩৩/৫)

বুঝা গেল যে, জেনে-বুঝে ভুল করা কারো জন্য জায়েয নয়। চাই তিনি মুজতাহিদ হোন বা অন্য কেউ। সেকারণ যার নিকট দলীলের আলোকে হক কথা প্রকাশিত হবে, তার জন্য স্বয়ং নিজে ভুলের উপর চলার অবকাশ থাকবে আর না অন্যদেরকে তার উপর চালানোর। স্বয়ং মুজতাহিদগণ তাদের ভুল বুঝতে পারলে তা থেকে ফিরে আসতেন। সেজন্য যে ব্যক্তি মুজতাহিদগণের পদাঙ্ক অনুসরণ করার দাবী করছেন তাকে তাঁদের মত ভুল পথ থেকে সরে এসে হকের প্রতি আগুয়ান হওয়ার প্রমাণ দিতে হবে।

উদাহরণ স্বরূপ ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর উক্তি দেখুন। তিনি স্বীয় শিষ্য ইমাম আবু ইউসুফকে বলেন,وَيْحَكَ يَا يَعْقُوْبُ لَا تَكْتُبْ كُلَّ مَا تَسْمَعُ مِنِّيْ فَإِنِّي قَدْ أَرَى الرَّأْيَ الْيَوْمَ وَأَتْرُكُهُ غَدًا وَأَرَى الرَّأْيَ غَدًا وَأَتْرُكُهُ بَعْدُ غَداً ‘সাবধান হে ইয়া‘কূব (আবু ইউসুফ)! আমার নিকট থেকে যা-ই শুনো তাই-ই লিখে নিয়ো না। কেননা আমি আজ যে রায় দেই, কাল তা পরিত্যাগ করি। কাল যে রায় দেই পরশু তা প্রত্যাহার করি’।[5]

৪. কোন একজন ইমামের তাক্বলীদ ওয়াজিব হওয়ার উপর কখনো ইজমা হয়নি[6] :

এখানে কোন মানুষ একথা বলতে পারেন যে, আমরা মুজতাহিদের মতামতকে এজন্য ছাড়তে পারি না যে, তাঁদের তাক্বলীদের উপর উম্মতের ইজমা হয়েছে। এসব বুযুর্গদের নিকটে নিবেদন হ’ল যে, তাদের এ দাবী স্ববিরোধিতা ও মতানৈক্যের শিকার। আব্দুল হাই লাক্ষ্ণৌবী বলেন,مذہب معين كي تقليد کے وجوب کے بارے ميں ہر زمانہ     كے علماء  ميں  اختلاف رہا ہے- ‘নির্দিষ্ট মাযহাবের তাক্বলীদ ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে সব যুগের আলেমদের মাঝে মতানৈক্য ছিল’।[7]

দেখুন ‘প্রত্যেক যুগে কোন এক মাযহাবের তাক্বলীদ ওয়াজিব হওয়ার উপর আলেমগণ একমত হ’তে পারেননি। এখন প্রশ্ন হ’ল এই যে, তাহ’লে এ ‘ইজমা’ সর্বশেষ কোন যুগে হয়েছে? প্রকৃত সত্য এই যে, উম্মতের কোন ব্যক্তিকে নবী ব্যতীত অন্য কারো সকল কথার অনুসারী করা কোন দলীল দ্বারা প্রমাণিত নয়। মুসলমানরা না এর উপর কখনো একমত হয়েছে, আর না একমত হ’তে পারে। এটা শুধু দাবী। যার পিছনে মাযহাবী গোঁড়ামি ও নিজেদের আবিষ্কৃত মাযহাবকে অন্য মাযহাবের উপর প্রাধান্য দেয়ার মনোবৃত্তি ছাড়া অন্য কোন দলীল নেই। বরং ‘ইজমা’ তো এর উল্টো হয়েছে।

স্বয়ং আশরাফ আলী থানবী ছাহেব বলেন, ‘যদিও এ বিষয়ে ইজমা উল্লেখ করা হয়েছে যে, চার মাযহাবকে বর্জন করে পঞ্চম মাযহাব সৃষ্টি করা জায়েয নয়। অর্থাৎ যে মাসআলাটি চার মাযহাব অনুসারীদের বিরোধী হবে, তার উপরে আমল করা জায়েয নয়। কারণ এই চার মাযহাবের মধ্যেই হক সীমাবদ্ধ ও সীমিত রয়েছে। কিন্তু এর পক্ষেও কোন দলীল নেই। কেননা আহলে যাহের বা যাহেরী মতবাদের লোকজন প্রত্যেক যুগেই বিদ্যমান রয়েছে। আর এটাও নয় যে, তারা প্রত্যেকে প্রবৃত্তিপূজারী এবং উক্ত ঐক্যমত থেকে আলাদা থাকবে। দ্বিতীয়তঃ যদি ইজমা সাব্যস্তও হয়ে যায়, তবুও তাক্বলীদে শাখছীর উপরে তো কখনো ইজমা-ই হয়নি’।[8]

এখানে কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে-

(১) কোন কোন কথার উপর ইজমার দাবী করা হ’লেও তা দলীল বিহীন।

(২) হক চার মাযহাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ হওয়ার দাবী দলীলের দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক নয়।

(৩) তাক্বলীদে শাখছীর উপর তো আদতে কখনো ইজমা হয়-ইনি।

এ বিষয়টিকে সামনে রাখলে উম্মতের কাউকে এক ইমাম অথবা চার মাযহাবের কোন একটির অনুসারী করা একটা দলীল বিহীন বিষয়ের অনুসরণকারী করার নামান্তর। সকল যুগে বিদ্বানগণ যার বিরোধিতা করেছেন।

[চলবে]

[1].وَمِنْهَا تَقْلِيد غير الْمَعْصُوم أَعنِي غير النَّبِي الَّذِي ثبتَتْ عصمته، وَحَقِيقَته أَن يجْتَهد وَاحِد من عُلَمَاء الْأمة فِي مَسْأَلَة، فيظن متبعوه أَنه على الْإِصَابَة قطعا أَو غَالِبا، فيردوا بِهِ حَدِيثا صَحِيحا، وَهَذَا التَّقْلِيد غير مَا اتّفق عَلَيْهِ الْأمة المرحومة، فَإِنَّهُم اتَّفقُوا على جَوَاز التَّقْلِيد للمجتهدين مَعَ الْعلم بِأَن الْمُجْتَهد يُخطئ، ويصيب، وَمَعَ الاستشراف لنَصّ النَّبِي صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمِنْهَا تَقْلِيد غير الْمَعْصُوم أَعنِي غير النَّبِي الَّذِي ثبتَتْ عصمته، وَحَقِيقَته أَن يجْتَهد وَاحِد من عُلَمَاء الْأمة فِي مَسْأَلَة، فيظن متبعوه أَنه على الْإِصَابَة قطعا أَو غَالِبا، فيردوا بِهِ حَدِيثا صَحِيحا، وَهَذَا التَّقْلِيد غير مَا اتّفق عَلَيْهِ الْأمة المرحومة، فَإِنَّهُم اتَّفقُوا على جَوَاز التَّقْلِيد للمجتهدين مَعَ الْعلم بِأَن الْمُجْتَهد يُخطئ، ويصيب، وَمَعَ الاستشراف لنَصّ النَّبِي صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগাহ ১/২১২-২১৩ পৃ.। ইবনু তায়মিয়া বলেছেন,أَمَّا وُجُوبُ اتِّبَاعِ الْقَائِلِ فِي كُلِّ مَا يَقُولُهُ مِنْ غَيْرِ ذِكْرِ دَلِيلٍ يَدُلُّ عَلَى صِحَّةِ مَا يَقُولُ فَلَيْسَ بِصَحِيحِ؛ بَلْ هَذِهِ الْمَرْتَبَةُ هِيَ ” مَرْتَبَةُ الرَّسُولِ ” الَّتِي لَا تَصْلُحُ إلَّا لَهُ মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ৩৫/১২১।

[2]আল-আজবিবাহ আল-মুফীদাহ আন আসইলাতিল মানাহিজ আল-জাদীদাহ, প্রশ্ন-২৫।

[3]. বুখারী হা/৭৩৫২; মুসলিম হা/৩২৪০।

[4]জামেউ বায়ানিল ইলম, পৃঃ ২০১৪, ই‘লামুল মুওয়াক্কিঈন ১/৫৭

[5]. ইবনু আবেদীন, আল-বাহরুর রায়েক্ব-এর হাশিয়া ৬/২৯৩

[6]. وَقد صَحَّ إِجْمَاع الصَّحَابَة كلهم أَوَّلهمْ عَن آخِرهم وَإِجْمَاع التَّابِعين أَوَّلهمْ عَن آخِرهم على الِامْتِنَاع وَالْمَنْع من أَن يقْصد مِنْهُم أحد إِلَى قَول إِنْسَان مِنْهُم أَو مِمَّن قبلهم، فَيَأْخذهُ كلهم (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ ২/২৬৩-৬৪, চারশত হিজরীর আগের ও পরের লোকদের অবস্থার বর্ণনা)

[7]. আব্দুল হাঈ, মাজমূ ফাতাওয়া, পৃ. ১৪৯, ১২৯ নং প্রশ্নের জবাব দ্রঃ।

[8]. তাযকিরাতুর রশীদ ১/১৩১।

আহলে হাদীস জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা (৩য় কিস্তি)

Untitled-Project

আহলেহাদীছ জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা (৩য় কিস্তি)

মূল (উর্দূ) : মাওলানা আবু যায়েদ যমীর
ভারতের প্রখ্যাত আহলেহাদীছ আলেম।
অনুবাদ : তানযীলুর রহমান
শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়া, রাজশাহী।

ভুল ধারণা-৪ :

আহলেহাদীছগণ আল্লাহর ওলীদেরকে অস্বীকারকারী :

কেউ কেউ এটা মনে করেন যে, আহলেহাদীছগণ আল্লাহর ওলীদেরকে মানেন না। কোন কোন বক্তা একথাকে রংচং লাগিয়ে আহলেহাদীছদের বিরুদ্ধে আমজনতাকে ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করে থাকেন। অথচ প্রকৃত সত্য এই যে, আহলেহাদীছগণ বেলায়াত (আল্লাহর নৈকট্য) মানেন। এমনকি কিয়ামত পর্যন্ত এর দরজা উন্মুক্ত থাকার আক্বীদা পোষণ করেন।

১. আহলেহাদীছদের নিকটে ওলী কারা? মহান আল্লাহ বলেন,أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ، الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ- ‘মনে রেখ আল্লাহর বন্ধুদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তান্বিত হবে না। যারা ঈমান আনে এবং সর্বদা আল্লাহকে ভয় করে’ (ইউনুস ১০/৬২, ৬৩)

কুরআন মাজীদের অসংখ্য আয়াতে এ কথা সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে যে, কোন কোন বান্দাকে তাদের পরিপূর্ণ ঈমান ও সার্বক্ষণিক আল্লাহভীতি অবলম্বনের ভিত্তিতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর পক্ষ থেকে ‘বেলায়াত’ প্রদান করে থাকেন। তাদেরকে তাঁর একান্ত আপন ও নৈকট্যশীল বান্দা করে নেন। একথা অস্বীকার করা কুরআন মাজীদ ও ছহীহ হাদীছ সমূহকে অস্বীকার করার নামান্তর। আহলেহাদীছগণ এসব দলীলের উপর দৃঢ় বিশ্বাস করতঃ অকপটে আল্লাহর ওলীদের মর্যাদা প্রদান করে থাকেন। কিন্তু কুরআনের উল্লেখিত আয়াতে যেখানে ওলীদের মর্যাদা ও তাদের জন্য আল্লাহর ওয়াদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে তাদের গুণাবলীও বর্ণনা করা হয়েছে। যেসব গুণের কারণে ওলীগণ এ মর্যাদায় অভিষিক্ত সেগুলি কী? তা হ’ল দু’টি বিষয়- (১) পরিপূর্ণ ঈমান (২) পূর্ণ তাক্বওয়া। আহলেহাদীছদের আক্বীদা এই যে, মযবুত ঈমান ও তাক্বওয়ার গুণে বিভূষিত হওয়া ছাড়া কোন মানুষ আল্লাহর ওলী হ’তে পারে না। ঐ ব্যক্তিই আল্লাহ তা‘আলার বেলায়াত বা বন্ধুত্বের হকদার, যার আক্বীদা হবে বিশুদ্ধ এবং জীবনাচরণ হবে তাক্বওয়ার মূর্তপ্রতীক।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হ’ল, অনেক মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত মানদন্ডকে  অবজ্ঞা  করে  কপোলকল্পিত   মূলনীতি   সমূহের আলোকে যাকে ইচ্ছা ওলী বানিয়ে দেয়। চাই তার জীবন নবীদের সর্দার মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর শিক্ষা সমূহের যতই খেলাফ হোক না কেন এবং ঈমান ও আমলের দিক থেকে সেই শিক্ষার সাথে তার দূরতম সম্পর্কও না থাক। বিস্ময়কর কিছু প্রকাশিত হওয়াকে ওলী হওয়ার মানদন্ড বানিয়ে নেয়। ফলে তারা এমন লোককেও আল্লাহর ওলী বানিয়ে দেয় যারা ছালাত-ছিয়াম পরিত্যাগ করে নেশায় চুর হয়ে অনর্থক কথা বলায় ব্যস্ত থাকে। যখন অন্তর্দৃষ্টির উপর প্রচলিত ধ্যান-ধারণার পট্টি বেঁধে দেওয়া হয় তখন এরূপ কারিশমা প্রকাশিত হয়।

২. আহলেহাদীছদের নিকটে বিস্ময়কর ঘটনা সমূহ ওলী হওয়ার দলীল নয় : কিছু অলৌকিক জিনিস কাউকে ওলী প্রমাণের জন্য দলীল হ’তে পারে না। বরং আসল কষ্টিপাথর হল কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ। আসুন! এ ব্যাপারে জানা যাক যে, ইমাম শাফেঈ (রহঃ) কী মূলনীতি বর্ণনা করেছেন। ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেন,إِذَا رَأَيْتُمُ الرَّجُلَ يَمْشِي عَلَى الْمَاءِ وَيَطِيرُ فِي الْهَوَاءِ فَلَا تَغْتَرُّوا بِهِ حَتَّى تَعْرِضُوا أمرَه على الكتابِ والسنةِ ‘যখন তুমি কাউকে পানির উপর হাঁটতে এবং হাওয়ায় উড়তে দেখবে, তখন মোটেই ধোঁকায় পড়বে না। যতক্ষণ না তার কর্মকান্ডকে কুরআন ও সুন্নাহর মানদন্ডে পরিমাপ করবে’।[1] অর্থাৎ কেউ যতই অলৌকিক কিছু দেখাক না কেন তাতে ধোঁকায় পড়বে না। বুঝা গেল যে, কেবল কারামতের ভিত্তিতে কাউকে ওলীর মর্যাদা প্রদান করা আলেমদের রীতি নয়। বরং তাদের নিকট প্রকৃত ওলী তিনি যার আক্বীদা ও আমল, প্রকাশ্য ও গোপন সব কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণে হবে।

এ কথাটি বর্ণনা করেছেন দ্বিতীয় শতাব্দীর একজন প্রসিদ্ধ আলেমে দ্বীন খলীল ইবনু আহমাদ আল-ফারাহীদী, যিনি বড় তাবে তাবেঈদের অন্যতম। তিনি বলেন,إِنْ لَمْ يَكُنْ أَهْلُ الْقُرْآنِ وَالْحَدِيثِ أَوْلِيَاءَ اللهِ، فَلَيْسَ لِلَّهِ فِي الْأَرْضِ وَلِيٌّ ‘যদি কুরআন ও হাদীছের অনুসারী ব্যক্তি আল্লাহর ওলী না হন তবে পৃথিবীতে আল্লাহর কোন ওলী নেই’।[2] অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার প্রকৃত ওলী হওয়ার হকদ্বার তারাই যারা কুরআন ও হাদীছের ধারক-বাহক এবং তার উপর আমলকারী।

৩. আহলেহাদীছদের নিকট আল্লাহ্ই উপকার ও ক্ষতি করার মালিক : এখানে এ বিষয়টিও লক্ষণীয় যে, ওলীদেরকে মানা ও তাদের কবরের নিকট চাওয়ার মধ্যে আসমান-যমীন পার্থক্য রয়েছে। প্রথমটি স্বয়ং ঈমানের দাবী, কিন্তু দ্বিতীয়টি তাওহীদের সম্পূর্ণ বিপরীত। আহলেহাদীছদের আক্বীদা হল, পৃথিবীতে আল্লাহর ইচ্ছাই কার্যকর হয়। মানুষের উপর সুখ-দুঃখ, আরাম-কষ্ট যা কিছু আসে তা আল্লাহরই ফায়ছালার ফলশ্রুতি। আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত না কেউ কাউকে কিছু দিতে পারে, আর না কারো নিকট থেকে কিছু ছিনিয়ে নিতে পারে। সৃষ্টিজগতে আল্লাহর ইচছাই কার্যকর হয়। এজন্য একজন মুসলিমকে তার সকল বিষয়ে আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِنْ يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ يُصِيبُ بِهِ مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ ‘আল্লাহ যদি তোমাদের কাউকে কোন কষ্ট দিতে চান, তবে তিনি ব্যতীত আর কেউ সেটাকে প্রতিহত করতে পারবে না। আর তিনি যদি তোমাদের কারো কল্যাণ করতে চান, তবে তোমাদের উপর কৃত অনুগ্রহকে কেউ ফিরাতে পারবে না। তিনি স্বীয় বান্দাদের যাকে চান অনুগ্রহ দান করেন। তিনি বড় ক্ষমাশীল ও অত্যন্ত দয়াবান (ইউনুস ১০/১০৭)

৪. আহলেহাদীছদের নিকট কবরের ইবাদত করা ও তাকে সিজদার স্থানে পরিণত করা হারাম : সম্মানিত ওলীগণ বা যেকোন মুসলমানের কবরকে অসম্মান করা আহলেহাদীছদের নিকট গুনাহের কাজ। কিন্তু ওলীদের কবরের নিকটে কামনা-বাসনা করা, তাদের কবর তওয়াফ করা, সেখানে গিয়ে সিজদা করা এবং এই আক্বীদা পোষণ করা যে, তারা আমাদের সমস্যা সমাধান করেন, আমাদেরকে রিযিক ও সন্তান-সন্ততি দান করেন এবং রোগমুক্তি দান করেন, এমনকি তাদের কবরের  মাটি ও দড়িও আমাদের সফলতা ও পরিত্রাণ দিয়ে থাকে, এ সকল আক্বীদা-আমল আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর শিক্ষা ও তাঁর ছাহাবীদের কর্মপদ্ধতির সম্পূর্ণ বিপরীত। আহলেহাদীছগণ অবশ্যই ওলীদেরকে সম্মান করেন, কিন্তু তাদেরকে আল্লাহর রুবূবিয়াত ও উলূহিয়াতে শরীক করেন না। তারা তাদের কবরকে অসম্মান করেন না, কিন্তু তাদের কবরগুলিকে রব ও মা‘বূদও বানিয়ে নেন না।

কবর সমূহকে ইবাদতখানা বানানো ইহুদী-নাছারাদের তরীকা। ইহুদী-নাছারাদের অনুকরণ করা তো এমনিতেই নিষেধ, উপরন্তু ইসলামে কবরগুলিকে সিজদার স্থান বানানোর ব্যাপারে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বলেন, أَلَا وَإِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوا يَتَّخِذُونَ قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ وَصَالِحِيهِمْ مَسَاجِدَ، أَلَا فَلَا تَتَّخِذُوا الْقُبُورَ مَسَاجِدَ، إِنِّي أَنْهَاكُمْ عَنْ ذَلِكَ ‘সাবধান! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবী ও সৎকর্মশীল বান্দাদের কবরগুলিকে মসজিদ (সিজদার স্থান) বানিয়ে নিত। সুতরাং তোমরা কখনো কবর সমূহকে মসজিদ বানাবে না। আমি তোমাদের এ থেকে নিষেধ করছি’।[3]

ইসলামে মসজিদ এমন স্থানকে বলা হয়, যেখানে আল্লাহকে সিজদা করা হয়। যখন কবর সমূহকে মসজিদ বানানো জায়েয নয়, তখন সেই কবরে কিভাবে সিজদা দেওয়া যায়? সিজদা ইবাদত। আর আল্লাহ তা‘আলা এ ব্যাপারে নিষেধ করে দিয়েছেন যে, আমরা যেন আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে সিজদা না করি। মহান আল্লাহ বলেন,وَمِنْ آيَاتِهِ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ لَا تَسْجُدُوا لِلشَّمْسِ وَلَا لِلْقَمَرِ وَاسْجُدُوا لِلَّهِ الَّذِي خَلَقَهُنَّ إِنْ كُنْتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ-  ‘আর এ রাত, দিন, সূর্য ও চন্দ্র আললাহ তা‘আলার নিদর্শনের অন্যতম। সেকারণ না তোমরা সূর্যকে সিজদা করবে, না চন্দ্রকে। বরং ঐ আল্লাহকে সিজদা করবে যিনি এসবকে সৃষ্টি করেছেন। বাস্তবে যদি তোমরা আল্লাহর ইবাদত করে থাক’ (ফুছছিলাত ৪১/৩৭)

তাওহীদের স্বীকৃতি প্রদানের পর শিরকী পথে চলা মুমিনের নিদর্শন নয়। সেজন্য আহলেহাদীছগণ যেকোন ইবাদতে আল্লাহর সাথে কোন ব্যক্তিকে শরীক করেন না। চাই সে ব্যক্তি যত বড়ই হোক না কেন। আহলেহাদীছগণ তাদের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য কবরস্থ নেক্কার ব্যক্তিদেরকে ডাকেন না। আহলেহাদীছদের নিকট এরূপ কাজ শিরক। কারণ দো‘আ ইবাদত। আর আল্লাহ ব্যতীত কারো কাছে দো‘আ-প্রার্থনা করা তাকে আল্লাহর ইবাদতে শরীক করার নামান্তর।

৫. আল্লাহর ওলীগণ স্বয়ং ঐ সকল ব্যক্তির দুশমন, যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকে : মহান আল্লাহ বলেন,وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللهِ مَنْ لَا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَنْ دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ، وَإِذَا حُشِرَ النَّاسُ كَانُوا لَهُمْ أَعْدَاءً وَكَانُوا بِعِبَادَتِهِمْ كَافِرِيْنَ- ‘তার চেয়ে বড় পথভ্রষ্ট আর কে আছে, যে আল্লাহকে ছেড়ে এমন বস্ত্তকে ডাকে যে কিয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়া দিবে না? আর তারাও তাদের আহবান সম্পর্কে কিছুই জানেনা। যেদিন মানুষকে সমবেত করা হবে, সেদিন এইসব উপাস্যরা তাদের শত্রু হবে এবং তারা তাদের পূজার বিষয়টি অস্বীকার করবে’ (আহক্বাফ ৪৬/৫-৬)

এ আয়াতে ঐ সকল মানুষকে গোমরাহ বলা হয়েছে, যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট প্রার্থনা করে। আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকটে দো‘আ করা মূলতঃ তার ইবাদত করার নামান্তর। সেকারণ আহলেহাদীছদের নিকট আল্লাহ ছাড়া কোন কবর বা কবরস্থ ব্যক্তিদের নিকটে প্রয়োজন পূরণের প্রার্থনা করা শিরক। এ ধরনের আমল না কুরআন ও সুন্নাহতে রয়েছে। আর না কোন ছাহাবী থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। যদি এটা আসলেই ইসলামে বৈধ হ’ত তাহলে ছাহাবীগণ অবশ্যই নবী (ছাঃ)-এর কবরের নিকট গিয়ে তাদের দ্বীন-দুনিয়ার সব সমস্যার সমাধান চাইতেন।

৬. আহলেহাদীছরা আল্লাহর নিকটে ইবাদত পৌঁছার জন্য ওলীদের অসীলা নির্ধারণ করেন না : আহলেহাদীছদের আক্বীদা এই যে, আল্লাহর নৈকট্য হাছিলের জন্য তাঁর বান্দাদেরকে অসীলা বানিয়ে আল্লাহর ইবাদতে তাদেরকে শরীক করা হারাম। সকল ইবাদত আল্লাহর জন্যই খাছ। এজন্য আল্লাহর ওলীদেরকে এভাবে অসীলা বানানো যে, তাদের নামে নযর-নেয়ায মেনে তাদের নামে পশু যবেহ করা অথবা তাদের নৈকট্য হাছিলের জন্য পশু যবেহ করা, তাদের কবর সমূহকে তওয়াফ করা, তাদের কবরে সিজদা করা প্রভৃতি শিরক। উপরন্তু এটা হুবহু সেই শিরক, যা রাসূল (ছাঃ)-এর যুগে আরব মুশরিকদের মাঝে বিদ্যমান ছিল। এটা শিরকের সেই প্রকার যার খন্ডনে কুরআন মাজীদের আয়াত নাযিল হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللهِ زُلْفَى إِنَّ اللهَ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فِي مَا هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ إِنَّ اللهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ-

‘যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্যকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছে (তারা বলে) আমরা তো এদের পূজা কেবল এজন্যেই করি যেন এরা (সুফারিশের মাধ্যমে) আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দিবে। আল্লাহ তাদের মধ্যে ফায়ছালা করে দিবেন, যে বিষয়ে তারা মতভেদ করছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মিথ্যাবাদী কাফিরকে সরল পথে পরিচালিত করেন না’ (যুমার ৩৯/৩)

আরবের মুশরিকরা আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য নিজ হাতে তৈরী মূর্তির পূজা করত। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহ, কিন্তু সে উদ্দেশ্য পূরণের জন্য যে পদ্ধতি তারা অবলম্বন করেছিল তা ভুল ছিল। আল্লাহর নিকট পৌঁছার জন্য শয়তান তাদেরকে যে পথ দেখিয়েছিল তা তাদেরকে আল্লাহ থেকে আরো দূরে সরিয়ে দিয়েছিল।

আহলেহাদীছগণ মনে করেন যে, সফলতা লাভের জন্য স্রেফ ভাল উদ্দেশ্যই যথেষ্ট নয়, বরং সে উদ্দেশ্য পূরণের জন্য গৃহীত পন্থা আল্লাহ ও তদীয় রাসূল (ছাঃ) আনীত শরী‘আত মোতাবেক হওয়াও যরূরী।

[চলবে]

[1]. হাফেয ইবনু কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ১৩/২১৭।

[2]. খতীব বাগদাদী, শারফু আছহাবিল হাদীছ ক্রমিক ৯৬।

[3]. ছহীহ মুসলিম হা/৮২৭ ‘মসজিদ ও ছালাতের স্থান সমূহ’ অধ্যায়।

আহলেহাদীছ জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ- ২য় পর্ব

Untitled-Project (1)

আহলেহাদীছ জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা (২য় কিস্তি)

মূল (উর্দূ) : মাওলানা আবু যায়েদ যমীর
ভারতের প্রখ্যাত আহলেহাদীছ আলেম।
অনুবাদ : তানযীলুর রহমান
শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়া, রাজশাহী।

ভুল ধারণা-২ :

আহলেহাদীছরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর শানে বেয়াদবী করে :

আহলেহাদীছদের সম্পর্কে দ্বিতীয় ভুল ধারণা বা অপবাদ এই যে, তারা আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-কে সম্মান করে না। অনেকে অজ্ঞতাবশতঃ আহলেহাদীছদেরকে রাসূলকে অসম্মানকারী মনে করে। এমনকি কোন কোন আলেম তো আহলেহাদীছের আক্বীদা সম্পর্কে এতটাই অজ্ঞ যে, তারা স্পষ্টভাবে বলে, ‘আহলেহাদীছরা রাসূল (ছাঃ)-কে মানে না’।

অথচ বাস্তবতা এই যে, আহলেহাদীছদের নিকটে মুহাম্মাদ (ছাঃ) সমস্ত মাখলূকের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত। তাঁর মর্যাদা সমস্ত নবী ও রাসূলের চেয়ে বেশী। আমাদের এই আক্বীদার ভিত্তি স্বয়ং রাসূল (ছাঃ)-এর নিম্নোক্ত বাণী-أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلاَ فَخْرَ وَبِيَدِى لِوَاءُ الْحَمْدِ وَلاَ فَخْرَ وَمَا مِنْ نَبِىٍّ يَوْمَئِذٍ آدَمُ فَمَنْ سِوَاهُ إِلاَّ تَحْتَ لِوَائِى ‘ক্বিয়ামতের দিন আমি সমস্ত বনু আদমের নেতা হব। এতে আমার কোন গর্ব নেই। প্রশংসার ঝান্ডা আমার হাতে থাকবে। এতে গর্বের কিছু নেই। যে কোন নবী চাই তিনি আদম হোন বা অন্য কেউ, সেদিন সবাই আমার ঝান্ডার নীচে থাকবে’।[1]

ক্বিয়ামতের দিন সকল নবীর সর্দার হওয়া অন্য নবীদের উপর তার শ্রেষ্ঠত্বের দলীল। একথা আহলেহাদীছের নিকট স্বীকৃত।

১. আহলেহাদীছগণ নবী (ছাঃ)-কে তাঁর প্রকৃত মর্যাদা দানে বাড়াবাড়ি করে না :

নবী করীম (ছাঃ) যেখানে আমাদেরকে স্বীয় মর্যাদা সম্পর্কে বলেছেন, সেখানে একথাও জোর দিয়ে বলেছেন যে, আমরা যেন তাঁকে সম্মান করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি থেকে বেঁচে থাকি এবং তাঁর সম্মানের ক্ষেত্রে খ্রিষ্টানদের মত সীমাতিক্রম না করি। যেমন- রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,لاَ تُطْرُونِى كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ، فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ، فَقُولُوا عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُهُ ‘তোমরা আমার প্রশংসায় বাড়াবাড়ি কর না’।[2] যেমনটি নাছারারা মারইয়াম তনয়ের প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করেছে। বস্ত্ততঃ আমি আল্লাহর একজন বান্দা। অতএব তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল বল’।[3]

খ্রিষ্টানরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর অনুসারী ছিল। ঈসা (আঃ)-এর প্রতি ঈমান আনা সত্ত্বেও তারা পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। নাছারাদের ভ্রষ্টতা কি ছিল? তারা ঈসা (আঃ)-কে বান্দার মর্যাদার ঊর্ধ্বে স্থান দিয়ে মা‘বূদের আসনে বসিয়েছিল। তারা ঈসা (আঃ)-এর মর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়ে এত বেশী সীমালংঘন করেছিল যে, আল্লাহর যাত (সত্তা) ও ছিফাতে (গুণাবলী) তাঁকে আল্লাহর শরীক বানিয়ে দিয়েছিল। কেউ কেউ তাঁকে আল্লাহর পুত্র বলে অভিহিত করেছিল। যেমন মহান আল্লাহ বলেন,

وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمَنُ وَلَدًا، لَقَدْ جِئْتُمْ شَيْئًا إِدًّا، تَكَادُ السَّمَاوَاتُ يَتَفَطَّرْنَ مِنْهُ وَتَنْشَقُّ الْأَرْضُ وَتَخِرُّ الْجِبَالُ هَدًّا، أَنْ دَعَوْا لِلرَّحْمَنِ وَلَدًا، وَمَا يَنْبَغِي لِلرَّحْمَنِ أَنْ يَتَّخِذَ وَلَدًا، إِنْ كُلُّ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا آتِي الرَّحْمَنِ عَبْدًا-

‘তারা বলে, দয়াময় সন্তান গ্রহণ করেছেন। নিশ্চয়ই তোমরা এক ভয়ংকর কথা বলেছ। এতে যেন আকাশ সমূহ বিদীর্ণ হয়ে যাবে, পৃথিবী খন্ড-বিখন্ড হবে এবং পাহাড়সমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পতিত হবে। যেহেতু তারা দয়াময়ের উপর সন্তান আরোপ করেছে। অথচ সন্তান গ্রহণ করা দয়াময়ের জন্য শোভনীয় নয়। নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের নিকটে উপস্থিত হবে না দাস রূপে’ (মারইয়াম ১৯/৮৮-৯৩)। আবার কেউ তাকে আল্লাহই আখ্যায়িত করেছে। আল্লাহ বলেছেন,لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللهَ هُوَ الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ ‘যারা কুফরী করেছে তারা বলেছে যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ হ’ল মাসীহ ইবনে মারইয়াম’ (মায়েদা ৫/১৭)। তারা ঈসা (আঃ)-কে মানার পরেও কাফের হয়ে গেছে।

আল্লাহর নবী (ছাঃ) মুসলিম উম্মাহকে নাছারাদের মত বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন। সেকারণ নবী (ছাঃ)-এর নির্দেশ পালনার্থে আহলেহাদীছদের আক্বীদা এই যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি যে আল্লাহর বান্দা তা মন থেকে উধাও করা যাবে না। স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বলেন,أَيُّهَا النَّاسُ عَلَيْكُمْ بِتَقْوَاكُمْ وَلاَ يَسْتَهْوِيَنَّكمُ الشَّيْطَانُ أَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللهِ عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُهُ وَاللهِ مَا أُحِبُّ أَنْ تَرْفَعُونِى فَوْقَ مَنْزِلَتِى الَّتِى أَنْزَلَنِى اللهُ عَزَّ وَجَلَّ ‘হে মানবমন্ডলী! তোমরা নিজেদেরকে রক্ষা কর। অবশ্যই শয়তান যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে। আমি আব্দুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদ। আমি আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসূল। আল্লাহর কসম! আমি এটা পসন্দ করি না যে, আল্লাহ আমাকে যে মর্যাদা[4] দিয়েছেন তোমরা তাঁর ঊর্ধ্বে আমাকে উঠাবে’।[5]

এখানে দু’টি বিষয় জানা গেল-

(১) স্বয়ং নবী করীম (ছাঃ)-এর এ ব্যাপারটি অপসন্দীয় যে, তাঁকে তাঁর প্রকৃত অবস্থানের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া হবে।

(২) শয়তানের এটা খুব পসন্দ যে, সে মুসলমানদেরকে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত করে পথভ্রষ্ট করবে।

সেজন্য যে দরজা দিয়ে শয়তান প্রবেশের সম্ভাবনা আছে এবং সর্বদা থাকবে, আহলেহাদীছগণ সেই চোরা দরজার প্রতি সর্বদা সতর্ক দৃষ্টি রেখে যাচ্ছেন। যাতে তারা উম্মতে মুহাম্মাদীকে বাড়াবাড়ির এই রোগ থেকে রক্ষা করতে পারেন, যে রোগে খ্রিষ্টানরা আক্রান্ত হয়েছে। যার দরুন তারা অহির বাহক হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দুশমন হিসাবে আখ্যায়িত হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন,

وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرٌ ابْنُ اللهِ وَقَالَتِ النَّصَارَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللهِ ذَلِكَ قَوْلُهُمْ بِأَفْوَاهِهِمْ يُضَاهِئُونَ قَوْلَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَبْلُ قَاتَلَهُمُ اللهُ أَنَّى يُؤْفَكُونَ، اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهًا وَاحِدًا لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ-

‘ইহূদীরা বলে ওযায়ের আল্লাহর পুত্র এবং নাছারারা বলে মসীহ ঈসা আল্লাহর পুত্র। এটা তাদের মুখের কথা মাত্র। এরা তো পূর্বেকার কাফেরদের মতই কথা বলে (যারা বলত ফেরেশতারা আল্লাহর মেয়ে)। আল্লাহ ওদের ধ্বংস করুন! ওরা (তাওহীদ ছেড়ে) কোথায় চলেছে? তারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের আলেম-ওলামা ও পোপ-পাদ্রীদের এবং মারিয়াম পুত্র মসীহ ঈসাকে ‘রব’ হিসাবে গ্রহণ করেছে। অথচ তাদের প্রতি কেবল এই আদেশ করা হয়েছিল যে, তারা শুধুমাত্র এক উপাস্যের ইবাদত করবে। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। আর তারা যাদেরকে শরীক সাব্যস্ত করে, তিনি সেসব থেকে পবিত্র’ (তওবা ৯/৩০-৩১)

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

وَإِذْ قَالَ اللهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ أَأَنْتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَهَيْنِ مِنْ دُونِ اللهِ قَالَ سُبْحَانَكَ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أَقُولَ مَا لَيْسَ لِي بِحَقٍّ إِنْ كُنْتُ قُلْتُهُ فَقَدْ عَلِمْتَهُ تَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِي وَلَا أَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِكَ إِنَّكَ أَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ، مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلَّا مَا أَمَرْتَنِي بِهِ أَنِ اعْبُدُوا اللهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ وَكُنْتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا مَا دُمْتُ فِيهِمْ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنْتَ أَنْتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ وَأَنْتَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ، إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ-

‘(স্মরণ কর) যেদিন আল্লাহ বলবেন, হে মরিয়াম-তনয় ঈসা! তুমি কি লোকদের একথা বলেছিলে যে, তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে আমাকে ও আমার মাকে দুই উপাস্য হিসাবে গ্রহণ করে নাও? সে বলবে, আপনি (এসব অংশীবাদ থেকে) পবিত্র। আমার জন্য এটা শোভা পায় না যে, আমি এখন কথা বলি যা বলার কোন এখতিয়ার আমার নেই। যদি আমি বলে থাকি, তবে তা অবশ্যই আপনি জানেন। আপনি আমার মনের কথা জানেন, কিন্তু আমি আপনার মনের কথা জানি না। নিশ্চয়ই আপনি অদৃশ্য বিষয় সমূহ সর্বাধিক অবগত। আমি তাদেরকে কিছুই বলিনি এটা ব্যতীত যা আপনি আমাকে আদেশ করেছিলেন যে, তোমরা আল্লাহর দাসত্ব কর, যিনি আমার ও তোমাদের পালনকর্তা। আর আমি তাদের সম্পর্কে অবগত ছিলাম যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম। কিন্তু যখন আপনি আমাকে আপনার নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন, তখন থেকে আপনিই তাদের তত্ত্বাবধায়ক। আর আপনি সকল বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী। যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি দেন, তাহ’লে তারা আপনার বান্দা। আর যদি আপনি তাদের ক্ষমা করেন, তাহ’লে আপনি মহাপরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময়’ (মায়েদা ৫/১১৬-১১৮)

কোন কোন আলেম আহলেহাদীছদেরকে উদ্ধত প্রমাণ করতে গিয়ে কিছু দৃষ্টান্তস্বরূপ কথা বলে থাকেন। যেমন- আহলেহাদীছরা রাসূল (ছাঃ) নূরের তৈরী বলে মানে না। বরং তাঁকে মানুষ মনে করে। আহলেহাদীছরা নবী করীম (ছাঃ)-কে গায়েবজান্তা বলে মনে করে না এবং আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের জন্য তাঁকে অসীলা হিসাবে গ্রহণ করেন না প্রভৃতি।

আসুন! দেখা যাক এসব কথার সত্যতা কতটুকু?

(১) নূর ও মানুষ-এর মাসআলা : কোন কোন ব্যক্তির আক্বীদা হল নবী করীম (ছাঃ) নূরের তৈরী। তাদের দলীল কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াতটি, যেখানে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُبِينٌ ‘অবশ্যই তোমাদের নিকটে আল্লাহর পক্ষ থেকে নূর এবং সুস্পষ্ট কিতাব এসেছে’ (মায়েদাহ ৫/১৫)

ইবনুল জাওযী (রহঃ) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় নূর সম্পর্কে দুটি মত উল্লেখ করেছেন।

(এক) নূর দ্বারা স্বয়ং আল্লাহর নবী (ছাঃ) উদ্দেশ্য।

(দুই) এর দ্বারা ইসলাম উদ্দেশ্য ।

কিন্তু নবী কি সৃষ্টিগতভাবে নূর, নাকি তিনি অন্ধকারে লুক্কায়িত সত্যকে প্রকাশ্যে উন্মোচনকারী হিসাবে নূর? মুফাসসিরগণ এ প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন।

ইবনু জারীর ত্বাবারী (রহঃ) বলেন,يعني بالنور محمدًا صلى الله عليه وسلم الذي أنار الله به الحقَّ، وأظهر به الإسلام، ومحق به الشرك، فهو نور لمن استنار به يبيِّن الحقومن إنارته الحق، تبيينُه لليهود كثيرًا مما كانوا يخفون من الكتاب ‘এখানে নূর দ্বারা উদ্দেশ্য হ’লেন নবী করীম (ছাঃ)। যাঁর মাধ্যমে আললাহ তা‘আলা হক্বকে প্রকাশ করেছেন, ইসলামকে বিজয়ী করেছেন এবং শিরককে ধ্বংস করেছেন। এজন্য তিনি সেই ব্যক্তির জন্য নূর, যে তাঁর নিকট থেকে জ্যোতি হাছিল করতে চায়। তিনি সত্যকে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন। আর তাঁর হক উন্মোচন করার এটাও একটা দিক যে, তিনি এমন অনেক বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ইহূদীরা তাদের কিতাব থেকে যা গোপন করত।[6]

যদি এ আয়াতটি সম্পূর্ণ পড়া হয়, তাহ’লে ব্যাপারটি সুস্পষ্টভাবে বুঝা যাবে। পুরো আয়াতটি হল-

يَا أَهْلَ الْكِتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِمَّا كُنْتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَعْفُو عَنْ كَثِيرٍ قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُبِينٌ، يَهْدِي بِهِ اللهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ السَّلَامِ وَيُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِهِ وَيَهْدِيهِمْ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ-

‘হে আহলে কিতাবগণ! তোমাদের কাছে আমাদের রাসূল এসেছেন, যিনি বহু বিষয় তোমাদের সামনে বিবৃত করেন, যেসব বিষয় তোমরা তোমাদের কিতাব থেকে গোপন কর। আরও বহু বিষয় তিনি এড়িয়ে যান (অর্থাৎ প্রকাশ করেন না)। বস্ত্ততঃ তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ হ’তে এসেছে একটি জ্যোতি ও আলোকময় কিতাব। তা দ্বারা (অর্থাৎ কুরআন দ্বারা) আল্লাহ ঐসব লোকদের শান্তির পথ সমূহ প্রদর্শন করেন, যারা তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে এবং তিনি তাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহে (কুফরীর) অন্ধকার হ’তে (ঈমানের) আলোর দিকে বের করে আনেন। আর তিনি তাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করেন’ (মায়েদাহ ৫/১৫-১৬)

এখানে একথাও লক্ষ্যণীয় যে, আহলেহাদীছগণ নবী (ছাঃ)-কে সাধারণ মানুষ নয় বরং সর্বশ্রেষ্ট মানুষ গণ্য করেন। যদি তাঁকে মানুষ মনে করা তাঁর শানে বেয়াদবী হয়, তাহ’লে কেবল এটুকু দেখে নিন যে, স্বয়ং নবী (ছাঃ)-এর সর্বাধিক প্রিয় স্ত্রী ও উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা (রাঃ)-এর আক্বীদা কী ছিল? আয়েশা (রাঃ) বলেন, كان بشرا من البشر ‘আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) একজন মানুষই ছিলেন’।[7]

এখন হযরত আয়েশা (রাঃ)-কেও কি রাসূলের শানে বেয়াদবীকারিনী বলা যাবে? না, কখনোই নয়। অতএব নিজেদের আক্বীদা সংশোধন করতে হবে।

৩. অদৃশ্যের জ্ঞানের মাসআলা :

আহলেহাদীছগণ এটা মানেন যে, আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় নবী (ছাঃ)-কে কখনও কখনও এমন সব বিষয় জানিয়েছেন যা গায়েব বা অদৃশ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। জান্নাত, জাহান্নাম, আসমান, যমীন, অতীত ও ভবিষ্যতের এমন অনেক সংবাদ যা তিনি জানতেন না, সেগুলি তাকে বলা হয়েছে। কিন্তু অদৃশ্যের জ্ঞান আল্লাহ তা‘আলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এজন্য এ বিষয়ে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা যাবে না। এ সম্পর্কে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর আক্বীদা এবং এর সাথে তাঁর ফৎওয়াও শুনুন! আয়েশা (রাঃ) বলেন,مَنْ زَعَمَ أَنَّهُ يُخْبِرُ بِمَا يَكُونُ فِي غَدٍ، فَقَدْ أَعْظَمَ عَلَى اللهِ الْفِرْيَةَ والله يقول: قُلْ لَا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللهُ ‘যে ব্যক্তি এ দাবী করবে যে, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) আগামী দিনে কি হবে তা বলে দিতেন, তাহলে সে ব্যক্তি আল্লাহর উপর বড় মিথ্যারোপ করবে’।[8] কারণ স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘বলে দাও, নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের কেউ অদৃশ্যের জ্ঞান রাখে না আল্লাহ ব্যতীত’ (নামল ২৭/৬৫)।[9]

যেই আক্বীদা বা বিশ্বাস হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ছিল,  সেই আক্বীদাই হ’ল আহলেহাদীছদের আক্বীদা। এই আক্বীদার ভিত্তিতে কোন মুসলমান কি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর বিশুদ্ধ আক্বীদায় আপত্তি করার দুঃসাহস দেখাতে পারে? যদি না পারে, তাহ’লে কিসের ভিত্তিতে আক্বীদার কারণে সেই আহলেহাদীছদেরকে অপরাধী বলা হয়? গভীরভাবে চিন্তার বিষয় হ’ল, হযরত আয়েশা (রাঃ) স্বীয় আক্বীদার সমর্থনে কুরআনের আয়াত থেকেও দলীল সাব্যস্ত করেছেন। সুতরাং এটাকে স্রেফ তার নিজস্ব মত বলাটাও ভুল হবে।

৪. অসীলার মাসআলা :

আহলেহাদীছদের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ এটাও উত্থাপন করা হয় যে, তারা নবী করীম (ছাঃ)-কে অসীলা হিসাবে গ্রহণ করে না। এ অভিযোগের উত্তর এই যে, আহলেহাদীছদের নিকটে মহান আল্লাহর নৈকট্য হাছিলের একমাত্র উপায় হ’ল আক্বীদা ও আমলে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর অনুসরণ করা। আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি ও ক্ষমা লাভের একমাত্র ও নিশ্চিত অসীলা বা মাধ্যম হ’ল রাসূল (ছাঃ)-এর অনুসরণ। যে ব্যক্তি রাসূলের সুন্নাত সমূহের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে মনগড়া তরীকা আবিষ্কার করবে এবং সেটাকে অসীলা মেনে আল্লাহর নিকট কল্যাণ প্রাপ্তির আশা করবে, তাহ’লে এটা স্রেফ অর্থহীন আমলই হবে না; বরং সেটা হবে বিদ‘আত এবং পরকালে আল্লাহর শাস্তি লাভের কারণ।

অসীলা সম্পর্কে ছাহাবীদের কর্মপদ্ধতি কি ছিল? সুপথ প্রাপ্ত খলীফা হযরত উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-এর আদর্শের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হবে যে, নবী করীম (ছাঃ)-এর মৃত্যুর পর ছাহাবীগণ কি তাঁর যাত বা সত্ত্বার অসীলায় দো‘আ করতেন, না করতেন না?

আনাস বিন মালেক (রাঃ) বলেন,أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ  رضى الله عنه كَانَ إِذَا قَحَطُوا اسْتَسْقَى بِالْعَبَّاسِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَقَالَ اللَّهُمَّ إِنَّا كُنَّا نَتَوَسَّلُ إِلَيْكَ بِنَبِيِّنَا فَتَسْقِينَا وَإِنَّا نَتَوَسَّلُ إِلَيْكَ بِعَمِّ نَبِيِّنَا فَاسْقِنَا-قَالَ فَيُسْقَوْنَ  ‘অনাবৃষ্টির সময় ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) আববাস বিন আব্দুল মুত্তালিব এর অসীলায় বৃষ্টির জন্য দো‘আ করতেন এবং বলতেন, হে আল্লাহ! আমরা আমাদের নবী করীম (ছাঃ)-এর অসীলা দিয়ে দো‘আ করতাম এবং আপনি আমাদেরকে বৃষ্টি দান করতেন। এখন আমরা নবী করীম (ছাঃ)-এর চাচার অসীলা দিয়ে দো‘আ করছি, আপনি আমাদেরকে বৃষ্টি দান করুন। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর তারা বৃষ্টি প্রাপ্ত হ’ত’।[10]

হযরত ওমর (রাঃ)-এর উক্তি ‘পূর্বে আমরা আমাদের নবীর অসীলা গ্রহণ করতাম’ এর অর্থ হচ্ছে তিনি নবীর দো‘আর অসীলা গ্রহণ করেছেন, তাঁর যাত বা সত্ত্বার অসীলা গ্রহণ করেননি। কেননা নবী (ছাঃ)-এর মৃত্যুর পরেও যদি তাঁর যাতের অসীলায় দো‘আ করা জায়েয হ’ত তাহ’লে হযরত উমার (রাঃ) নবী (ছাঃ)-এর সত্ত্বাকে পরিহার করে আববাস (রাঃ)-কে নির্বাচন করতেন না। বরং তিনি রাসূল (ছাঃ)-এর কবরের পাশে গিয়ে তাঁর যাতের অসীলায় দো‘আ করতে পারতেন। সুতরাং প্রমাণিত হ’ল যে, এ অসীলা তাঁর যাত বা সত্ত্বার নয়, বরং তাঁর দো‘আর অসীলা ছিল। যা তাঁর মৃত্যুর পর এখন আর নেই। বাস্তব সত্য এই যে, ছাহাবীদের মাঝে কারো নাম বা যাতের অসীলায় দো‘আ করার রীতি ছিলই না, বরং এর পরিবর্তে কোন সৎ ব্যক্তির মাধ্যমে দো‘আ করানোর পদ্ধতি চালু ছিল। এজন্য ওমর (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ)-এর মৃত্যুর পর তাঁর চাচার মাধ্যমে দো‘আ করিয়েছেন।

এখানে একথাও স্পষ্ট হ’ল যে, নবী করীম (ছাঃ)-এর কবরের পাশে গিয়ে তাঁর নিকটে দো‘আর দরখাস্ত করার রীতিও ছাহাবীদের মাঝে ছিল না। থাকলে ওমর (রাঃ) এক্ষেত্রে অবশ্যই তা করতেন। অতএব আহলেহাদীছগণ এই তরীকার উপরেই আমল করছেন। যা স্বয়ং হযরত ওমর (রাঃ) থেকে প্রমাণিত যে, জীবিত উপস্থিত নেক ব্যক্তির মাধ্যমে দো‘আ করানো যাবে। কিন্তু এর বিপরীতে তাদের নাম নিয়ে তাদের যাতের অসীলায় দো‘আ করানো এমন একটি আমল, যা না কুরআন ও সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত, আর না ছাহাবীদের আমল দ্বারা।

ভুল ধারণা-৩ :

আহলেহাদীছরা ছাহাবায়ে কেরামকে মানে না এবং তাঁদেরকে অবজ্ঞা করে :

আহলেহাদীছদের সম্পর্কে তৃতীয় ভুল ধারণা এই যে, আহলেহাদীছরা ছাহাবায়ে কেরামকে মানে না, তাঁদের কথা গ্রহণ করে না এবং তাদের শানে বেয়াদবী করে।

বাস্তব সত্য এই যে, আহলেহাদীছদের নিকটে ছাহাবায়ে কেরাম আক্বীদা ও আমল উভয় ক্ষেত্রেই আদর্শ ও দলীল।

১. যারা নবী (ছাঃ) ও ছাহাবীদের পথে আছেন তারাই আহলেহাদীছদের নিকট হক্বপন্থী। আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বলেন,وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ مِلَّةً كُلُّهُمْ فِي النَّارِ إِلَّا مِلَّةً وَاحِدَةً قَالُوا وَمَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللهِ قَالَ مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي ‘আর আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। এদের সবাই জাহান্নামে যাবে শুধু একটি দল ব্যতীত। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! সেটি কোন দল? উত্তরে তিনি বললেন, যারা আমার ও আমার ছাহাবীদের পথের উপরে থাকবে’।[11]

পরবর্তী যুগে সৃষ্ট নানা মতভেদের সময় আহলেহাদীছদের নিকট হক্ব ও হক্বপন্থীদেরকে চেনার একমাত্র মাপকাঠি হ’ল ছাহাবীগণ। যে ব্যক্তি নবী (ছাঃ)-এর সুন্নাত ও ছাহাবীদের নীতির অনুসারী হবেন তিনিই আহলেহাদীছদের নিকটে হক্বপন্থী। যেসব আলেম কুরআন ও সুন্নাহর মনগড়া ব্যাখ্যাকে দলীলের মর্যাদা প্রদান করে উম্মতের ভিতরে বিদ‘আত ও কুসংস্কার সৃষ্টি করে, তাদের প্রত্যুত্তরে আহলেহাদীছগণ ছাহাবীদের পথ ও পদ্ধতি এবং মূলনীতি সমূহকে দলীল হিসাবে পেশ করে থাকেন।

এসব প্রমাণ থাকার পরেও জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে আহলেহাদীছদেরকে কটাক্ষ করা এবং তাদের উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা সর্বদা কিছু লোকের কাজ। এটা ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু প্রমাণহীন অপবাদ প্রত্যাখ্যাত হওয়ার জন্য নিজেই যথেষ্ট।

২. ছাহাবীগণকে মন্দ অভিহিতকারী রাসূল (ছাঃ)-এর লা‘নতের হকদার : আহলেহাদীছদের নিকটে ছাহাবীগণকে গাল-মন্দকারী, তাদের মর্যাদাহানিকারী এবং তাঁদের উপর থেকে উম্মতের নির্ভরতাকে প্রশ্নবিদ্ধকারী লা‘নতের হকদার। কারণ স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) এমন ব্যক্তিকে ‘অভিশপ্ত’ আখ্যা দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ سَبَّ أَصْحَابِي فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللهِ، وَالْمَلَائِكَةِ، وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ‘যে ব্যক্তি আমার ছাহাবীদেরকে গালি দিবে তার উপর আল্লাহ, ফেরেশতামন্ডলী এবং সকল মানুষের লা‘নত’।[12]

৩. ছাহাবীগণ নবী করীম (ছাঃ)-এর বিপরীতে খোলাফায়ে রাশেদীনের কথাও পরিত্যাগ করতেন। প্রত্যেক ছাহাবীর মর্যাদা ও সম্মান সর্বজনস্বীকৃত। কিন্তু অনেক বড় ব্যক্তিত্বও দলীলের চেয়ে বড় হ’তে পারেন না। দলীল-প্রমাণাদির ওযন সর্বদা ব্যক্তিত্বের চাইতে বেশী হয়ে থাকে।

ছাহাবীদের নিকটে খোলাফায়ে রাশেদীন সম্মানের পাত্র ছিলেন। তারা তাঁদের নির্দেশ ও সিদ্ধান্ত মেনে নিতেন। কিন্তু ছাহাবীগণ নবী (ছাঃ)-এর কথার বিপরীতে অনেক বড় ব্যক্তির কথাও গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করতেন। তারা বয়োজ্যেষ্ঠদের সাথে বেয়াদবী করতেন না। কিন্তু তারা তাদেরকে সম্মান করার নামে তাদের কথাকে কিতাব ও সুন্নাতের উপরে প্রাধান্য দানকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।

হযরত আলী (রাঃ)-এর একটি ফায়ছালা এবং সে সম্পর্কে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ)-এর ব্যাখ্যা থেকে উক্ত বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে যায়।

ইকরিমা (রহঃ) বলেন,أُتِيَ عَلِيٌّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ بِزَنَادِقَةٍ فَأَحْرَقَهُمْ، فَبَلَغَ ذَلِكَ ابْنَ عَبَّاسٍ، فَقَالَ: لَوْ كُنْتُ أَنَا لَمْ أُحْرِقْهُمْ، لِنَهْيِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لاَ تُعَذِّبُوا بِعَذَابِ اللهِ وَلَقَتَلْتُهُمْ، لِقَوْلِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ بَدَّلَ دِيْنَهُ فَاقْتُلُوْهُ ‘হযরত আলী (রাঃ)-এর নিকটে কিছু যিন্দীককে (নাস্তিক) নিয়ে আসা হ’ল। তিনি তাদের সবাইকে পুড়িয়ে মারলেন। এ সংবাদ হযরত ইবনু আববাস (রাঃ)-এর নিকটে পৌঁছলে তিনি বললেন, যদি আমি তার জায়গায় ফায়ছালাকারী হতাম তাহ’লে তাদেরকে পোড়ানোর হুকুম দিতাম না। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরূপ করতে নিষেধ করে বলেছেন, তোমার আল্লাহর শাস্তি দিয়ে মানুষকে শাস্তি দিয়ো না। আর আমি তাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দিতাম। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, যে স্বীয় দ্বীন পরিবর্তন করবে তাকে হত্যা করো’।[13]

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, فَبَلَغَ ذَلِكَ عَلِيًّا، فَقَالَ: صَدَقَ ابْنُ عَبَّاسٍ ‘ইবনু আববাসের এমন মন্তব্য হযরত আলী (রাঃ)-এর নিকট পৌঁছলে তিনি বলেন, ইবনু আববাস ঠিক বলেছেন’।[14]

এই ঘটনায় একদিকে যেমন হযরত ইবনু আববাস (রাঃ)-এর হক্ব কথা বলার দৃষ্টান্ত রয়েছে, তেমনি অন্য দিকে হযরত আলী (রাঃ)-এর হক্বকে মেনে নেওয়ার নমুনাও বিদ্যমান রয়েছে। ইবনু আববাস (রাঃ) আলীর ফায়ছালার বিপরীতে নবীর হাদীছ বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে, আমি হ’লে কখনো এরূপ করতাম না। ইবনু আববাস (রাঃ) এটা বলেননি যে, আলী যা করেছেন সে বিষয়ে তাঁর নিকটে অবশ্যই কোন না কোন দলীল রয়েছে। বরং যে সত্য স্বয়ং তাঁর নিকটে ছিল তার আলোকে আলীর ফায়ছালার ব্যাপারে তার ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। হযরত আলী (রাঃ)ও তাঁর এ কাজকে ভুল, গোমরাহী বা বেয়াদবী বলেননি। বরং তিনি নিজে স্পষ্ট ভাষায় তাঁর মতামতকে সত্যায়ন ও সমর্থন করেছেন।

৪. ছাহাবীগণ রাসূল (ছাঃ)-এর বিপরীতে কারো কথা মানতেন না।

এ ব্যাপারে খোদ হযরত আলী (রাঃ)-এর নীতিও এর বিপরীত ছিল না। তিনিও এ মূলনীতির অনুসারী ছিলেন যে, যত বড় ব্যক্তিই হোক না কেন তার কথা ও কাজ রাসূলের কথা ও কাজের মোকাবিলায় অনুসরণযোগ্য নয়। এর একটি উদাহরণ ছহীহ বুখারীর একটি বর্ণনায় মওজুদ রয়েছে।

মারওয়ান বিন হাকাম বলেন,شَهِدْتُ عُثْمَانَ، وَعَلِيًّا رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا وَعُثْمَانُ يَنْهَى عَنِ المُتْعَةِ، وَأَنْ يُجْمَعَ بَيْنَهُمَا، فَلَمَّا رَأَى عَلِيٌّ أَهَلَّ بِهِمَا، لَبَّيْكَ بِعُمْرَةٍ وَحَجَّةٍ، قَالَ: مَا كُنْتُ لِأَدَعَ سُنَّةَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِقَوْلِ أَحَدٍ ‘আমি সেই সময় হযরত ওছমান ও আলী (রাঃ)-এর নিকটে উপস্থিত ছিলাম, যখন হযরত ওছমান (রাঃ) হজ্জে তামাত্তু থেকে নিষেধ করে বলছিলেন, হজ্জ ও ওমরাকে একত্রিত করা উচিত নয়। যখন হযরত আলী (রাঃ) এ ব্যাপারটি লক্ষ করলেন তখন বললেন, لَبَّيْكَ بِعُمْرَةٍ وَحَجَّةٍ এবং বললেন, আমি কারো কথার উপর ভিত্তি করে  নবীর সুন্নাতকে ছেড়ে দিতে পারি না’।[15]

আলী (রাঃ) নবীর সুন্নাতের মোকাবিলায় ওছমান (রাঃ)-এর ফায়ছালা গ্রহণ করেননি। উল্লেখিত দু’টি বর্ণনায় হযরত ইবনু আববাস ও আলী (রাঃ)-এর কর্মপদ্ধতি থেকে একথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, স্বয়ং ছাহাবীগণ খোলাফায়ে রাশেদীনের যে মতটি রাসূলের কথা ও কাজের সাথে সাংঘর্ষিক হত তা মেনে নিতেন না। এটাই আহলেহাদীছদের মূলনীতি।

সামগ্রিকভাবে ছাহাবীদের কথা দলীল। কিন্তু যখন তাঁদের পরস্পরের মধ্যে কোন বিষয়ে মতভেদ দেখা দিবে তখন এমতাবস্থায় সেই মতটিকে প্রাধান্য দিতে হবে যার স্বপক্ষে দলীল মওজুদ থাকবে। আর কিতাব ও সুন্নাতের মোকাবিলায় কারো কোন কথা গ্রহণ করা যাবে না।

উল্লেখিত ঘটনা দু’টিতে একথাও সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, কখনো কখনো বড় বড় ছাহাবীদের নিকটেও রাসূলের কোন বাণী পৌঁছত না। এর ফলেও কখনো কখনো তাদের দ্বারা রাসূলের কথা ও কাজের বিপরীত ইজতিহাদ সংঘটিত হয়ে যেত। এরূপ পরিস্থিতিতে অন্য ছাহাবীগণ কল্যাণকামিতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাদেরকে সতর্ক করে দিতেন।

………চলবে ইনশাআল্লাহ্‌    

[1]. মুসনাদে আহমাদ হা/২৫৪৬; সুনানে তিরমিযী হা/৩১৪৮; ইবনু মাজাহ হা/৪৩০৮; ছহীহুল জামে হা/১৪৬৮।

[2]. আবূ সাঈদ হতে ইবনুত তীন বলেন,مَعْنَى قَوْلِهِ لَا تُطْرُونِي لَا تَمْدَحُونِي كَمَدْحِ النَّصَارَى حَتَّى غَلَا بَعْضُهُمْ فِي عِيسَى فَجَعَلَهُ إِلَهًا مَعَ اللهِ وَبَعْضُهُمُ ادَّعَى أَنَّهُ هُوَ الله وَبَعْضهمْ بن الله ইবনুত তীন নবী (ছাঃ)-এর উক্তি ‘আমার প্রশংসায় বাড়াবাড়ি কর না’-এর সম্পর্কে বলেছেন, খ্রিষ্টানদের মত তোমরা আমার প্রশংসা কর না। এমনকি তাদের কেউ কেউ ঈসা সম্পর্কে বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিল। তারা তাকে আল্লাহর সাথে ইলাহ বানিয়ে নিয়েছিল। আর তাদের কতিপয় এই দাবী করেছিল যে, ঈসা হলেন আল্লাহ। আর কেউ দাবী করেছিল যে, তিনি আল্লাহর পুত্র। (ফাতহুল বারী, ‘দন্ডবিধি’ অধ্যায়)।

[3]. বুখারী হা/৩৪৪৫, ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, উমার (রাঃ) হতে

[4]. মুসনাদে আহমাদ হা/১০৯৭; ছহীহা হা/১০৯৭, আনাস বিন মালেক (রাঃ) থেকে

[5]. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِيَّاكُمْ وَالْغُلُوَّ فِى الدِّينِ فَإِنَّمَا أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمُ الْغُلُوُّ فِى الدِّينِ ‘হে লোক সকল! তোমরা দ্বীনের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করা হতে বেঁচে থাকো। কেননা তোমাদের পূর্বে যারা দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে তারা ধ্বংস হয়ে গেছে’ (ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, ছহীহুল জামে হা/২৬৮০, ছহীহ; শব্দগুলি ইবনু মাজাহ-এর, ছহীহ ইবনু মাজাহ হা/২৪৫৫; ছহীহা হা/১২৮৩)।

[6]. জামিউল বায়ান ১০/১৪৩, তাহক্বীক্ব : আহমাদ শাকের

[7]. মুসনাদে আহমাদ হা/২৬২৩৭, শু‘আইব আরনাঊত্ব একে ছহীহ বলেছেন।   

[8]. মুসলিম হা/১৭৭।

ومَنْ زَعَمَ أَنَّهُ يعلم مَا فِي غَدٍ، فَقَدْ أَعْظَمَ الْفِرْيَةَ ‘আর যে ধারণা করল যে, তিনি আগামী দিনে কি হবে তা জানেন সে (আল্লাহর উপর) কঠিনভাবে মিথ্যারোপ করল ‘তাফসীরুল কুরআন’ অনুচ্ছেদ হা/৩০৬৮, ছহীহ)।   

[9]. أعظم الفرية على الله من قال : إن محمداً صلى الله عليه وسلم رأى ربه وإن محمداً صلى الله عليه و سلم كتم شيئاً من الوحي وإن محمداً صلى الله عليه و سلم يعلم ما في غد ‘আল্লাহর উপর বড় মিথ্যাচার সে করল যে বলল, নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ (ছাঃ) তার রবকে দেখেছেন, মুহাম্মাদ (ছাঃ) অহীর কিছু অংশ গোপন করেছেন এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ (ছাঃ) আগামীতে কি হবে তা জানেন’ (আত-তা‘লীক্বাতুল হিসান হা/৬০, ছহীহ)।

[10]. ছহীহ বুখারী হা/১০১০, ‘জুম‘আ’ অধ্যায়    

[11]. তিরমিযী হা/৫৩৪৩; ছহীহুল জামে হা/৫৩৪৩, হাদীছ হাসান।    

[12]. ছহীহুল জামে হা/৬২৮৫, সনদ হাসান, ইবনু আববাস (রাঃ) হতে।     

[13]. ছহীহুল বুখারী, হা/৬৯২২।      

[14]. তিরমিযী হা/১৪৫৮, হাদীছ ছহীহ।       

[15]. ছহীহুল বুখারী হা/১৫৬৩

আহলে হাদীছ জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা -১ম কিস্তি

Untitled-Project (3)

আহলেহাদীছ জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা

মূল (উর্দূ) : মাওলানা আবু যায়েদ যমীর
ভারতের প্রখ্যাত আহলেহাদীছ আলেম।
অনুবাদ : তানযীলুর রহমান
শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়া, রাজশাহী।

হামদ ও ছানার পর কোন ব্যক্তি বা দল সম্পর্কে মন্তব্য করা বা সিদ্ধান্ত প্রদানের দু’টি পদ্ধতি রয়েছে। প্রথমত :গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে উঠে প্রকৃত তথ্য ও তত্ত্বের ভিত্তিতে মন্তব্য করা। এ পদ্ধতিটি স্বয়ং ঈমান ও তাক্বওয়ার দাবী রাখে। দ্বিতীয়ত : শুধু ভুল ধারণাগুলিকে সত্যের মর্যাদা প্রদান করতে গিয়ে স্রেফ গোঁড়ামির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত প্রদান করা। দুর্ভাগ্যবশতঃ অধিকাংশ মানুষকে এই দ্বিতীয় পন্থা অবলম্বন করতে দেখা যায়। অধিকাংশ মানুষ সত্যের পরিবর্তে স্রেফ ধারণার বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত প্রদান করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَمَا يَتَّبِعُ أَكْثَرُهُمْ إِلَّا ظَنًّا إِنَّ الظَّنَّ لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شَيْئًا إِنَّ اللهَ عَلِيمٌ بِمَا يَفْعَلُونَ. ‘ওদের অধিকাংশ কেবল ধারণার অনুসরণ করে। অথচ সত্যের মোকাবেলায় ধারণা কোন কাজে আসে না। নিশ্চয়ই তারা যা কিছু করে, সকল বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবগত’ (ইউনুস ১০/৩৬)।

দিনের আলোকে অন্ধকার বলায় যেমন তা অাঁধার হয়ে যায় না, তেমনি ব্যক্তিগত অনুরাগ ও ধারণা প্রকৃত সত্যকে পরিবর্তন করতে পারে না। ন্যায়নীতির পথ থেকে সরে গিয়ে প্রদত্ত ফায়ছালা সত্যকে বদলাতে পারে না। কিন্তু তা মানুষের চিন্তা-চেতনা,  আমল ও পরিণতিকে বরবাদ করে দেয়।

কেউ সামনে দাঁড়ালে একজন মানুষ যদি চোখ বন্ধ করে অনুমান ভিত্তিক তার চেহারা-ছুরত ও পোষাক-পরিচ্ছদ সম্পর্কে বর্ণনা দেয়, তাহ’লে কেউই এটাকে বুদ্ধিমানের কাজ বলবে না। কিন্তু দুঃখের বিষয় হ’ল, যখন আহলেহাদীছ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত প্রদানের সময় আসে, তখন অধিকাংশ মানুষ এ কর্মপদ্ধতির প্রমাণ পেশ করতে শুরু করে।

বহু মানুষ রয়েছে যারা স্রেফ ভুল ধারণার কারণে আহলেহাদীছদের উপরে অসন্তুষ্ট হয়। এমন মানুষকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে, আপনি কি আসলে এ বিষয়টি যাচাই-বাছাই করেছেন? যেসব আক্বীদা ও মূলনীতিকে আহলেহাদীছদের সাথে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে সেগুলো কি আপনি নিজে আহলেহাদীছদের মুখ থেকে শুনেছেন বা তাদের বইপুস্তকে পড়েছেন? তখন তার কাছ থেকে এর ইতিবাচক উত্তর পাওয়া যায় না। বরং তার উত্তর থেকে বুঝা যায় যে, সে অন্য কারো কাছ থেকে একথা শুনেছে যে, আহলেহাদীছরা এরূপ বলে বা তারা এরূপ কাজ করে। যদি আসলেই সে সরাসরি কোন আহলেহাদীছকে জিজ্ঞেস করত তাহ’লে আসল বিষয়টি  তার  কাছে  একেবারে পরিষ্কার হয়ে যেত। সব ভুল ধারণা ও অসন্তুষ্টির অবসান ঘটত। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হ’ল, মানুষ এমনটা করার সাহস না করে আলোর পরিবর্তে অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকাকেই প্রাধান্য দেয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, أَلَا سَأَلُوا إِذْ لَمْ يَعْلَمُوْا ‘যখন তারা জানে না তখন কেন জিজ্ঞেস করে না’?[1]

আহলেহাদীছ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মাঝে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। যা তাদের মনে আহলেহাদীছ সম্পর্কে ঘৃণার উদ্রেক হওয়ার অন্যতম কারণ। তারা আহলেহাদীছ আলেমদের কাছে এসে নিজেরা জিজ্ঞেস করে না। কারণ তাদেরকে ভয় দেখানো হয় যে, তোমরা যদি আহলেহাদীছ আলেমদের ধারে-কাছেও যাও তাহ’লে তোমরা গোমরাহ হয়ে যাবে।

এই পুস্তকটি এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে লেখা হচ্ছে যে, যারা আহলেহাদীছদের দাওয়াত ও মানহাজ (কর্মপদ্ধতি) সম্পর্কে জানতে চায়, তারা যেন সংক্ষিপ্তাকারে কিছু মৌলিক কথা জানতে পারে। যাতে নিজেদের পূর্বের জানা তথ্যগুলিকে পুনরায় বিচার-বিশ্লেষণ করে সঠিক সিদ্ধান্ত প্রদান করা তাদের জন্য সহজসাধ্য হয়।

আহলেহাদীছ সম্পর্কে ভুল ধারণা ও অপবাদের একটি লম্বা তালিকা রয়েছে। সংক্ষিপ্ততার প্রতি খেয়াল রেখে এই পুস্তিকায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংশয় নিরসন করা হচ্ছে। বিস্তারিত আলোচনা ও গবেষণার জন্য আহলেহাদীছ আলেমদের রচিত গ্রন্থসমূহ অথবা আলেমদের শরণাপন্ন হ’তে পারেন।

চলুন দেখি যে, আহলেহাদীছদের সম্পর্কে কি কি ভুল ধারণা রয়েছে এবং এক্ষেত্রে বাস্তবিকই আহলেহাদীছদের অবস্থান কি?

ভুল ধারণা-১ :

আহলেহাদীছ একটি নতুন ফিরক্বা, যা ইংরেজদের সৃষ্টি :

আহলেহাদীছ সম্পর্কে প্রথম ভুল ধারণা এই যে, এটি একটি নতুন ফিরক্বা। অতীতে এই দলের কোন অস্তিত্ব ছিল না। ভারতবর্ষে ইংরেজরা এই দলের গোড়াপত্তন করেছে। এটা স্রেফ ঐতিহাসিক বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞতার ফল। আহলেহাদীছ কি অতীতে ছিল না? এটা কি ইংরেজদের সৃষ্ট দ্বীন? আহলেহাদীছের ইতিহাস কি একশ’ বা দুইশ’ বছরের বেশী পুরাতন নয়? আসুন দেখা যাক, সত্য কোন্টি?

(১) নবী করীম (ছাঃ) হ’লেন আহলেহাদীছদের নেতা[2] :

হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) আল্লাহ তা‘আলার বাণী, يَوْمَ نَدْعُو كُلَّ أُنَاسٍ بِإِمَامِهِمْ ‘(স্মরণ কর) যেদিন আমরা প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাদের নেতা (অর্থাৎ নবী অথবা আমলনামা) সহ আহবান করব’ (বনী ইসরাঈল ১৭/৭১)-এর তাফসীরে বলেন,وَقَالَ بَعْضُ السَّلَفِ: هَذَا أَكْبَرُ شَرَفٍ لِأَصْحَابِ الْحَدِيثِ؛ لِأَنَّ إِمَامَهُمُ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ‘কোন কোন সালাফ বলেন, আহলেহাদীছদের জন্য এটাই সর্বোচচ মর্যাদা যে, তাদের একমাত্র ইমাম হ’লেন নবী করীম (ছাঃ)’।[3]

তাফসীর ইবনু কাছীর সকলের নিকট একটি নির্ভরযোগ্য তাফসীর।[4] ইবনু কাছীর ৭০১ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৭৭৪ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। না তিনি হিন্দুস্থানের ছিলেন আর না সে সময় ইংরেজদের কোন অস্তিত্ব ছিল। উপরন্তু ইবনু কাছীর আহলেহাদীছদের সম্পর্কে এখানে নিজের কথা নয়; বরং তাঁর পূর্বের বিদ্বানের উক্তি উল্লেখ করেছেন। যার মাধ্যমে একথা প্রতীয়মান হয়েছে যে, সালাফে ছালেহীনের মাঝে ‘আছহাবুল হাদীছ’ নামে বিদ্যমান বিদ্বানগণ আল্লাহর নবী (ছাঃ)-কে তাদের ইমাম বা নেতা মানতেন।

আরোপিত অপবাদ খন্ডনের জন্য কি শুধু এ কথাটুকুই যথেষ্ট নয় যে, আজ থেকে সাতশত বছরেরও বেশী পুরাতন গ্রন্থে একজন নির্ভরযোগ্য মুফাসসির, মুহাদ্দিছ ও ঐতিহাসিক আহলেহাদীছদের মর্যাদা সম্পর্কে কুরআনের আয়াত ও সালাফে ছালেহীনের উক্তি দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন?

প্রকৃত সত্য এই যে, আহলেহাদীছদের অস্তিত্ব ইবনু কাছীরের চেয়েও প্রাচীন।

(২) ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর অনুসারীদের যুগে আহলেহাদীছদের অস্তিত্ব :

হানাফী মাযহাবের গ্রন্থ ‘দুররে মুখতার’-এর ব্যাখ্যা  ‘রাদ্দুল মুহতার’-এ ইবনু আবেদীন লিখেছেন, حُكِيَ أَنَّ رَجُلًا مِنْ أَصْحَابِ أَبِي حَنِيفَةَ خَطَبَ إلَى رَجُلٍ مِنْ أَصْحَابِ الْحَدِيثِ ابْنَتَهُ فِي عَهْدِ أَبِي بَكْرٍ الْجَوزَجَانِيِّ فَأَبَى إلَّا أَنْ يَتْرُكَ مَذْهَبَهُ فَيَقْرَأَ خَلْفَ الْإِمَامِ، وَيَرْفَعُ يَدَيْهِ عِنْدَ الِانْحِطَاطِ وَنَحْوُ ذَلِكَ فَأَجَابَهُ فَزَوَّجَهُ- ‘বর্ণিত আছে যে, আবুবকর জাওযাজানীর যুগে আবু হানীফার জনৈক অনুসারী একজন আহলেহাদীছ ব্যক্তির মেয়েকে বিবাহের প্রস্তাব দিলে তিনি (আহলেহাদীছ) তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তবে এ শর্তে রাযী হ’ন যে, সে তার মাযহাবকে পরিত্যাগ করে ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পাঠ করবে এবং রুকূতে যাওয়ার সময় ও অন্যান্য ক্ষেত্রে রাফ‘ঊল ইয়াদায়েন করবে। অতঃপর সে আহলেহাদীছের শর্তসমূহ মেনে নিলে তিনি তার মেয়ের সাথে তার (হানাফী) বিবাহ দিয়ে দেন’।[5]

আবুবকর জাওযাজানী ইমাম মুহাম্মাদ বিন হাসান শায়বানীর ছাত্র আবু সুলায়মান জাওযাজানীর ছাত্র। আর ইমাম মুহাম্মাদ স্বয়ং ইমাম হানীফা (রহঃ)-এর ছাত্র।

এ ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর শিষ্যদের যুগেও আহলেহাদীছদের অস্তিত্ব ছিল। শুধু তাই নয়; বরং সে যুগেও আহলেহাদীছগণ কিছু কিছু ফিক্বহী মাসআলা-মাসায়েল যেগুলিকে শাখা-প্রশাখাগত মাসআলা বলে অপ্রমাণিত আখ্যা দেয়া হয়। যেমন ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পাঠ, রাফ‘ঊল ইয়াদায়েন প্রভৃতি বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতেন। এ ঘটনা থেকে এটাও জানা যায় যে, আহলেহাদীছ বিদ্বানগণ দ্বীনের ব্যাপারে অনেক চিন্তাশীল ও পাকাপোক্ত ছিলেন। তাদের নিকটে আত্মীয়তার সম্পর্কের চেয়েও দ্বীন বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নিজেদের কন্যাদের বিবাহ দেওয়ার পূর্বে তারা বিবাহের প্রস্তাব পেশকারীকে রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশ ও সুন্নাতের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার জন্য রাযী করে নিতেন।

এ ঘটনা থেকে শুধু আহলেহাদীছদের প্রাচীনত্ব প্রমাণিত হয় না, বরং সূচনালগ্ন থেকেই দ্বীনের ব্যাপারে তাদের আপোষহীনতাও প্রমাণিত হয়। যা স্বয়ং দ্বীনী পোক্ততা ও অবিচলতার প্রমাণ। এমনকি আমরা যদি এর চেয়েও পূর্বের যুগ পর্যালোচনা করি তবুও আহলেহাদীছদের অস্তিত্ব পাওয়া যাবে।

(৩) আহলেহাদীছদের প্রতি ইমাম আবু হানীফার শিষ্য আবু ইউসুফ (রহঃ)-এর টান :

ইয়াহ্ইয়া বিন মাঈন (রহঃ) বলেন,كَانَ أَبُو يوسف القاضي يحب أصحاب الحديث ويميلُ إليهم. ‘ক্বাযী আবু ইউসুফ আহলেহাদীছদেরকে ভালবাসতেন এবং তাদের প্রতি তাঁর টান ছিল’।[6]

দেখুন! আহলেহাদীছদের অস্তিত্ব শুধু আবু হানীফা (রহঃ)-এর বিশিষ্ট ছাত্র ইমাম ক্বাযী আবু ইউসুফ (রহঃ)-এর যুগেই ছিল তা প্রমাণিত হয়নি, বরং একথাও জানা গেল যে, স্বয়ং ইমাম আবু ইউসুফ আহলেহাদীছদের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। এমনকি তাদের প্রতি তাঁর টান ছিল।

এখানে এ প্রশ্ন দেখা দেয় যে, কোন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে কি আহলেহাদীছদের মধ্যে গণনা করা হয়েছে, যার জ্ঞানগত মর্যাদা বিদ্বানদের নিকটে স্বীকৃত এবং যাকে সাধারণ মানুষও চিনে? আসুন! একথাও হানাফী মাযহাবেরই একটা প্রসিদ্ধ কিতাব থেকে জানা যাক।-

(৪) ইমাম বুখারী (রহঃ) অন্যতম আহলেহাদীছ ছিলেন :

‘আয়নুল হেদায়া’তে লেখা আছে,

ہم   نے    اجماع     كيا    كہ    شافعي   و مالكي   و حنبلي  بلكه   تمام    اہل   حديث   مثل   امام   بخاري   و غيره   وابن   جرير   طبري    حتي   كہ   علماءے   ظاهر   يه   سب    اہل السنة  والجماعة    برحق   ہيں   اور    سب  كا   تمسك    قرآن   واحاديث   اہل  السنة   پر  عقائد   حقہ   كے   ساتھ  ہے-

‘আমরা ইজমা করেছি যে, শাফেঈ, মালেকী, হাম্বলী, বরং সমস্ত আহলেহাদীছ যেমন ইমাম বুখারী প্রমুখ ও ইবনু জারীর ত্বাবারী এমনকি যাহেরী আলেমগণ এরা সবাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহ ও সঠিক। তারা সকলেই সঠিক আক্বীদার সাথে আহলুস সুন্নাহর উপরে প্রতিষ্ঠিত থেকে কুরআন ও সুন্নাহকে অাঁকড়ে ধরেন’।[7]

এখানে কয়েকটি বিষয় চিন্তার দাবী রাখে যা নিম্নরূপ-

১. হানাফী বিদ্বানগণের ইজমা রয়েছে যে, সকল আহলেহাদীছ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহ এবং সবাই সঠিক।

২. আহলেহাদীছরা যাহেরী নন। বরং দু’টা পৃথক।

৩. মুফাসসির ইবনু জারীর ত্বাবারী ও মুহাদ্দিছ ইমাম বুখারী (রহঃ) দু’জনই আহলেহাদীছ ছিলেন।

ইমাম বুখারী (রহঃ)-এর মত উচ্চ মর্যাদাবান ব্যক্তির নাম ইমাম শাফেঈ, মালেকী, হাম্বলীর পরিবর্তে আহলেহাদীছের উদাহরণে উল্লেখ করা না শুধু আহলেহাদীছদের প্রাচীনত্বের প্রমাণ; বরং মর্যাদাও বটে।

এক্ষণে এটাও দেখা দরকার যে, আহলেহাদীছদের ব্যাপারে স্বয়ং ইমাম শাফেঈ, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল ও ইমাম বুখারী (রহঃ)-এর মত কি?

(৫) ইমাম আহমাদ, বুখারী ও ইবনুল মুবারকের নিকটে ‘সাহায্যপ্রাপ্ত দল’ হল আহলেহাদীছ :

বিভিন্ন শব্দে ও সনদে একটি হাদীছ বুখারী ও মুসলিমসহ অন্যান্য কিতাবে এসেছে, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي قَائِمَةً بِأَمْرِ اللهِ، لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ أَوْ خَالَفَهُمْ، حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللهِ وَهُمْ ظَاهِرُونَ عَلَى النَّاسِ ‘চিরদিন আমার উম্মতের মধ্যে একটি দল দ্বীনের উপরে প্রতিষ্ঠিত থাকবে। পরিত্যাগকারী বা বিরোধিতাকারীরা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এমতাবস্থায় ক্বিয়ামত এসে যাবে, অথচ তারা মানুষের উপরে বিজয়ীই থাকবে’।[8]

এই দল কোন্টি? এর উত্তরের জন্য আসুন দেখি উম্মতের সম্মানিত ইমামগণের বক্তব্য কি?

ফযল বিন যিয়াদ বলেন,سَمِعْتُ أَحْمَدَ بْنَ حَنْبَلٍ، وَذَكَرَ حَدِيثَ: لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ عَلَى الْحَقِّ، فَقَالَ: إِنْ لَمْ يَكُونُوا أَصْحَابَ الْحَدِيثِ فَلَا أَدْرِي مَنْ هُمْ؟ ‘আমি ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ)-এর কাছ থেকে শুনেছি, তিনি নিম্নোক্ত হাদীছটি বর্ণনা করেন ‘চিরদিন আমার উম্মতের মধ্যে একটি দল হক্বের উপরে বিজয়ী থাকবে’। অতঃপর তিনি বলেন, তাঁরা যদি আহলেহাদীছ না হন, তবে আমি জানি না তারা কারা’।[9]

অর্থাৎ ইমাম আহমাদের নিকটে এ দল আহলেহাদীছ ব্যতীত অন্য কেউ হ’তেই পারে না।

ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেন, يَعْنِي أَصْحَابَ الْحَدِيثِ (হাদীছে উল্লেখিত দল দ্বারা) আহলুল হাদীছ উদ্দেশ্য’।[10]

আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক তাবে-তাবেঈদের মধ্যে গণ্য। তাঁর ব্যক্তিত্ব উম্মতের মাঝে কতটুকু স্বীকৃত তা ইমাম যাহাবী (রহঃ)-এর উক্তি থেকে জানা যায়। ইমাম যাহাবী বলেন, حديثه حجة بالاجماع ‘আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক বর্ণিত হাদীছ সমূহ সর্বসম্মতভাবে গ্রহণযোগ্য’।[11]

এ দলের ব্যাপারে আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহঃ) বলেন, هُمْ عِنْدِي أَصْحَابُ الْحَدِيثِ ‘আমার নিকটে তারা (অর্থাৎ হক্বের

উপর প্রতিষ্ঠিত দল) আহলুল হাদীছ’।[12]

এখানে যেন কেউ একথা না বলে যে, উক্ত উদ্ধৃতি সমূহে আছহাবুল হাদীছ শব্দটি এসেছে, আহলেহাদীছ নয়। স্মরণ রাখা দরকার যে, ‘আহলুলহাদীছ’ ও ‘আছহাবুল হাদীছ’ দু’টি শব্দের একটিই অর্থ। স্বয়ং মুহাদ্দিছগণ উভয় শব্দই ব্যবহার করতেন। যেমন এই হাদীছের ব্যাখ্যায় জগদ্বিখ্যাত মুহাদ্দিছ আলী ইবনুল মাদীনী (রহঃ) বলেন, هُمْ أَهْلُ الْحَدِيثِ ‘তারা (হক্বের উপর টিকে থাকা দল) হ’লেন আহলেহাদীছ’।[13]

এখানে আলী ইবনুল মাদীনী ‘আছহাবুল হাদীছ’-এর পরিবর্তে ‘আহলুলহাদীছ’ শব্দ ব্যবহার করেছেন।

আলী ইবনুল মাদীনী কে? আলী ইবনুল মাদীনীর মর্যাদা বর্ণনার জন্য ইমাম বুখারী (রহঃ)-এর উক্তিই যথেষ্ট। ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেন, مَا اسْتَصغَرْتُ نَفْسِي عِنْدَ أَحَدٍ إِلاَّ عِنْدَ عَلِيِّ بنِ المَدِيْنِيِّ. ‘আলী ইবনুল মাদীনী ব্যতীত আমি নিজেকে আর কারো সামনে ছোট মনে করতাম না’।[14]

এসব উদ্ধৃতি থেকে একথা প্রমাণিত হয় যে, সালাফে ছালেহীনের মাঝে ‘আহলেহাদীছ’ শব্দটি পরিচিত ছিল। আর এটা ঐ দলকে বলা হ’ত, যেটি ক্বিয়ামত পর্যন্ত হকের উপরে প্রতিষ্ঠিত থাকবে।

একটি সংশয় নিরসন :

এখানে একটা ভুল ভেঙ্গে দেওয়া যরূরী। সেটা হ’ল কেউ কেউ এ সংশয় পোষণ করে যে, উক্ত উদ্ধৃতিগুলিতে ‘আহলেহাদীছ’ শব্দটি মুহাদ্দিছদের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। কোন ফিরক্বা বা দলকে বুঝানোর জন্য নয়। তারা বলে যে, তাফসীর শাস্ত্রে অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে যেমন ‘মুফাসসির’ বা ‘আহলে তাফসীর’ বলা হয়, তেমনি হাদীছের জগতে দক্ষ ব্যক্তিকে ‘মুহাদ্দিছ’ বা ‘আহলেহাদীছ’ বলা হয়। কিন্তু এ কথাটি সঠিক নয়। এটা ভুল হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, যদি বাস্তবেই আহলেহাদীছ দ্বারা স্রেফ মুহাদ্দিছগণই উদ্দেশ্য হয় তাহ’লে হাদীছে ক্বিয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকা যেই দলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্য থেকে মুফাসসির ও ফক্বীহগণকে বের করতে হবে। হাদীছের শব্দগুলি ভালভাবে চিন্তা-ভাবনা করলে এ ভুল ধারনাটা আরো স্পষ্ট হয়ে যায়। কেননা হাদীছে আহলে বাতিলের মুকাবিলায় আহলেহাদীছকে উল্লেখ করা হয়েছে। আহলে ফিক্বহ ও আহলে তাফসীরের মুকাবিলায় নয়।

এ কথাটা আরো পরিষ্কার করার জন্য আমরা শায়খ আব্দুল কাদের জীলানী (রহঃ)-এর উক্তিটি পেশ করা যথোপযুক্ত মনে করছি, যা তার ‘গুনইয়াতুত ত্বলেবীন’ গ্রন্থে উদ্বৃত হয়েছে।

(৬) আহলুল হাদীছই আহলুস সুন্নাহ : শায়খ আব্দুল কাদের জীলানী (রহঃ) বলেন,

واعلم أن لأهل البدع علامات يعرفون بها. فعلامة أهل البدعة الوقيعة في أهل الأثر. وعلامة الزنادقة تسميتهم أهل الأثر: بالحشوية، ويريدون إبطال الآثار. وعلامة القدرية تسميتهم أهل الأثر: مجبرة. وعلامة الجهمية تسميتهم أهل السنة مشبهة. وعلامة الرافضة تسميتهم أهل الأثر: ناصبة. وكل ذلك عصبية وغياظ لأهل السنة، ولا اسم لهم إلا اسم واحد، وهو أصحاب الحديث. ولا يلتصق بهم ما لقبهم به أهل البدع، كما لم يلتصق بالنبي صلى الله عليه وسلم تسمية كفار مكة له ساحرًا وشاعرًا ومجنونًا ومفتونًا وكاهنًا، ولم يكن اسمه عند الله وعند ملائكته وعند إنسه وجنه وسائر خلقه إلا رسولًا نبيًا بريًا من العاهات كلها.

‘জেনে রাখ যে, বিদ‘আতীদের কিছু নিদর্শন রয়েছে, যা দেখে তাদের চেনা যায়। বিদ‘আতীদের লক্ষণ হ’ল আহলেহাদীছদের গালি দেওয়া ও বিভিন্ন বাজে নামে তাদেরকে সম্বোধন করা। যিনদীক্বদের (নাস্তিক) নিদর্শন হ’ল, তারা আহলে আছারকে হাশাবিয়া বলে থাকে। এর মাধ্যমে তারা আছারকে বাতিল সাব্যস্ত করতে চায়। ক্বাদারিয়াদের নিদর্শন হ’ল, তারা আহলেহাদীছদেরকে মুজবেরাহ বলে। জাহমিয়াদের নিদর্শন হ’ল তারা আহলুস সুন্নাহকে মুশাবিবহা তথা সাদৃশ্য স্থাপনকারী বলে। রাফেযীদের নিদর্শন হ’ল তারা আহলে আছারকে নাছেবাহ বলে। এগুলি সুন্নাতপন্থীদের বিরুদ্ধে তাদের দলীয় গোঁড়ামি ও অন্তর্জ্বালার বহিঃপ্রকাশ ভিন্ন কিছুই নয়। কেননা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের অন্য কোন নাম নেই একটি নাম ব্যতীত। সেটি হল ‘আছহাবুল হাদীছ’ বা ‘আহলেহাদীছ’। বিদ‘আতীদের এইসব গালি প্রকৃত অর্থে আহলেহাদীছদের জন্য প্রযোজ্য নয়। যেমন মক্কার কাফিরদের জাদুকর, কবি, পাগল, মাথা খারাপ, গায়েবজান্তা প্রভৃতি গালি রাসূল (ছাঃ)-এর জন্য প্রযোজ্য ছিল না। রাসূল (ছাঃ) আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা মন্ডলী, মানুষ, জ্বিন ও তাঁর সৃষ্টির নিকটে সকল দোষ-ত্রুটি থেকে পূত-পবিত্র একজন নবী ও রাসূল ছিলেন’।[15]

উপরোক্ত উদ্ধৃতিতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো চিন্তা-ভাবনার দাবী রাখে।

(১) শায়খ আব্দুল কাদের জীলানী (রহঃ) ভ্রান্ত ফিরক্বাগুলির বিপরীতে আহলেহাদীছ-এর কথা উল্লেখ করেছেন।

(২) তাঁর নিকটে আহলেহাদীছদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন কথা বলা বাতিল ফিরক্বাগুলির নিদর্শন।

(৩) তাঁর নিকটে আহলেহাদীছ ও আহলে সুন্নাত একই।

(৪) আহলুস সুন্নাতের একটাই নাম ‘আহলুল হাদীছ’।

এ সকল আলোচনার পর প্রশ্ন হ’ল, এরপরেও কি আহলেহাদীছকে একটি নতুন দল বলে সন্দেহের তীর নিক্ষেপ করা ঠিক হবে? আমরা এর জবাব সম্মানিত পাঠকদের হাতেই ছেড়ে দিলাম।

চলবে ………।ইনশাআল্লাহ

[1]. আলবানী, তাহক্বীক্ব আবুদাঊদ হা/৩৩৬, সনদ হাসান।

[2]. খত্বীব বাগদাদী (৩৯২-৪৬৩ হিঃ) বলেছেন,وَكُلُّ فِئَةٍ تَتَحَيَّزُ إِلَى هَوًى تَرْجِعُ إِلَيْهِ، أَوْ تَسْتَحْسِنُ رَأَيًا تَعْكُفُ عَلَيْهِ، سِوَى أَصْحَابِ الْحَدِيثِ، فَإِنَّ الْكِتَابَ عُدَّتُهُمْ، وَالسُّنَّةُ حُجَّتُهُمْ،  (শারফু আছহাবিল হাদীছ, পৃঃ ৭)।

[3]. তাফসীর ইবনু কাছীর ৫/৯৯ বনী ইসরাঈলের ৭১নং আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রঃ।  

[4]. ইসমাঈল বিন ওমর বিন কাছীর বিন যাও বিন দার‘ কুরাশী বছরী অতঃপর দামেশক্বী আবুল ফিদা ইমাদুদ্দীন। তিনি একজন হাদীছের হাফেয, ঐতিহাসিক ও ফক্বীহ। তদানীন্তন সিরিয়ার অন্তর্ভুক্ত বছরার একটি গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ৭০৬ হিজরীতে তিনি তার এক ভাইয়ের সাথে দামেশক্বে স্থানান্তরিত হন। তিনি ইলম অন্বেষণের জন্য ভ্রমণ করেছেন। তিনি দামেশক্বে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জীবদ্দশাতেই লোকেরা তাঁর গ্রন্থসমূহ প্রচার-প্রসার করেছেন (খায়রুদ্দীন যিরিকলী, আল-আ‘লাম ১/৩২০)।  

[5]. রাদ্দুল মুহতার ৪/৮০, ‘দন্ডবিধি’ অধ্যায়।  

[6]. তারীখু বাগদাদ ১৪/২৫৭।

[7]. আয়নুল হেদায়াহ ১/৫৩৮।  

[8]. ছহীহ মুসলিম হা/৩৫৪৮,‘ইমারত’ অধ্যায়।   

[9]. খত্বীব বাগদাদী, শারফু আছহাবিল হাদীছ, পৃঃ ৪২।  

[10]. ঐ, পৃঃ ৪৫।  

[11]. যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৮/৩৮০।  

[12]. শারফু আছহাবিল হাদীছ, পৃঃ ৪১।  

[13]. সুনানে তিরমিযী হা/২২২৯; শারফু আছহাবিল হাদীছ, পৃঃ ৯।  

[14]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১২/৪২০।  

[15]. গুনয়াতুত ত্বলেবীন ১/১৬৬।